নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে দুই ক্যাম্পাস সাংবাদিককে হেনস্তা, ধাক্কাধাক্কি এবং তাঁদের মুঠোফোনের ভিডিও ফুটেজ মুছে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের দাবি, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তাঁদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয়।
মঙ্গলবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হল ও পকেট গেটসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হেনস্তার শিকার দুই সাংবাদিক হলেন মানবজমিনের নোবিপ্রবি প্রতিনিধি মাহী ছিদ্দীকী সিয়াম এবং প্রতিদিনের সংবাদের নোবিপ্রবি প্রতিনিধি মেহেদী হাসান। তাঁরা দুজনই নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির সদস্য।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই রাতে আবদুল মালেক উকিল হলে ছাত্রদলের দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। সংঘর্ষের খবর পেয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থলে যান ক্যাম্পাস সাংবাদিকেরা।
মাহী ছিদ্দীকী সিয়ামের অভিযোগ, হলের ছাদের দিকে মারামারি, উচ্চবাচ্য ও চিৎকারের শব্দ শুনে তিনি পরিস্থিতি দেখতে সেখানে যান। কিছুক্ষণ পর হলের আলো বন্ধ হয়ে গেলে তিনি আলো জ্বালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী খান মোহাম্মদ রোম্মানসহ একজন তাঁকে ধাক্কা দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সিয়ামের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তিনি দেখতে পান ছাত্রদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকপন্থি এবং সিনিয়র সহসভাপতিপন্থি নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছে। এ সময় সমন্বয়ক জাহিদকেও ধাওয়া করে হল থেকে বের করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পকেট গেটের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পরিস্থিতির ভিডিও ধারণ করতে তিনি তাঁদের পেছনে যান।
সিয়াম অভিযোগ করেন, পকেট গেটের কাছে ভিডিও ধারণের সময় খান মোহাম্মদ রোম্মান, বাংলা বিভাগের ১৭তম আবর্তনের আতিক হাসান, অর্থনীতি বিভাগের ১৮তম আবর্তনের তানভীর ভূঁইয়া এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১৮তম আবর্তনের ফাইসাল হোসাইন তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেন। পরে রোম্মান তাঁকে ধাক্কা দেন এবং হাত ও ঘাড়ে আঘাত করেন বলে তাঁর অভিযোগ।
সিয়ামের দাবি, এরপর তাঁর মুঠোফোন দেখাতে বাধ্য করা হয়। ফোনটি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও জোর করে তা খোলানো হয় এবং সংঘর্ষের ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ মুছে দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু ভিডিও মুছে দেওয়াই নয়, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমও পরীক্ষা করা হয়—ভিডিওটি কোথাও পাঠানো হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। পরে তাঁকে ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ না করার কথা বলে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে প্রতিদিনের সংবাদের প্রতিনিধি মেহেদী হাসান বলেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা চলার সময় তিনি ও তাঁর সহকর্মী সিয়াম সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় ছাত্রদল কর্মী ফাইসাল হোসাইন তাঁদের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও ধারণ বন্ধ করতে বলেন। পরে তাঁদের দুজনকেই ধাক্কা দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন মেহেদী।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বাংলা বিভাগের ১৭তম আবর্তনের আতিক হাসান, অর্থনীতি বিভাগের ১৮তম আবর্তনের তানভীর ভূঁইয়া, আইন বিভাগের ১৯তম আবর্তনের খান মোহাম্মদ রোম্মান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১৮তম আবর্তনের ফাইসাল হোসাইন এবং কৃষি বিভাগের ১৮তম আবর্তনের এম কে এম আকরাম খান। তাঁদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করা এবং মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি নাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত দুই ক্যাম্পাস সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাঁরা দুজনই সাংবাদিক সমিতির সদস্য। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেওয়া হবে এবং ভয়ভীতিহীনভাবে সাংবাদিকতা করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হবে।
নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হোসেন বলেন, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নন এবং বিস্তারিত জানেন না। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ এফ এম আরিফুর রহমান বলেন, হলের প্রভোস্ট বডির সদস্যদের বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও অবহিত করা হয়েছে। তিনি জানান, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রক্টরিয়াল বডির একটি সভা ডাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগের বিষয়েও সাংবাদিক সমিতির সভাপতির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে বলে জানান প্রক্টর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, লিখিত বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।









