জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

নূপুরের শব্দে কাঁপে যে রাষ্ট্র: শিমা কেরমানি ও দেউলিয়া পাকিস্তানের ভীরুতা

একটি রাষ্ট্র কতটা দেউলিয়া, কতটা নৈতিকভাবে পঙ্গু এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভীরু হলে ৭৫ বছরের একজন বৃদ্ধার নাচের ছন্দে তার ক্ষমতার সিংহাসন কেঁপে ওঠে? গত ১৪ মে ২০২৪ সালের সেই উত্তাল রাতে করাচির রাজপথ থেকে যখন প্রখ্যাত ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী, মানবাধিকার কর্মী এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রদূত শিমা কেরমানিকে গ্রেপ্তার করা হলো, তখন বিশ্ববাসী কেবল একজন শিল্পীর ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের দৃশ্যই দেখেনি, বরং তারা দেখেছে একটি মুমূর্ষু রাষ্ট্র ব্যবস্থার চূড়ান্ত উলঙ্গ আত্মপ্রতারণা। খাতাকলমে তাঁর বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা অমান্য করা, বেআইনি জনসমাবেশ কিংবা রাস্তা অবরোধের মতো যেসব হাস্যকর ও গতানুগতিক আইনি ধারা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর পেছনে লুকানো ছিল এক গভীর রাজনৈতিক আতঙ্ক। কারণ, স্বৈরাচারী ও দেউলিয়া শাসককূলের কাছে সত্য, শিল্প এবং স্বাধীন ইচ্ছার চেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না। যে রাষ্ট্র তার ক্ষুধার্ত নাগরিকদের দুমুঠো অন্ন দিতে পারে না, যে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের কাছে নিজের মানসম্মান ও অর্থনীতি চিরতরে বন্ধক রেখে দিয়েছে, সেই দেউলিয়া পাকিস্তানের কাছে এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা আশা করা যেতে পারে?
শিমা কেরমানির অপরাধ কী ছিল? তিনি শাড়ি পরেন, কপালে বড় একটা লাল টিপ দেন, মঞ্চে উঠে ভরতনাট্যম পরিবেশন করেন এবং সবচেয়ে বড় কথা—তিনি বাঁচেন নিজের শর্তে। তিনি এমন একজন নারী যিনি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে সমাজে টিকে থাকার জন্য কোনো পুরুষতান্ত্রিক অনুশাসন বা তথাকথিত মুরুব্বিদের ‘অনুমতি’ নেওয়ার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন না। পাকিস্তানের মতো একটি কট্টরপন্থী ও পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ‘অনুমতি না চাওয়া’টাই হলো সবচেয়ে বড় অপরাধ। জেনারেল জিয়া-উল-হকের সেই অন্ধকার সামরিক শাসনের নিপিড়ক দিনগুলোতেও যখন সংস্কৃতির টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছিল, শিমা কেরমানি তখন ঘরে বসে থাকেননি। তিনি শাস্ত্রীয় নৃত্যকে বেছে নিয়েছিলেন প্রতিবাদের মোক্ষম ভাষা হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সমাজের যখন বাকরূদ্ধ করে দেওয়া হয়, তখন শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি, চোখের প্রতিটি পলক এবং নূপুরের প্রতিটি ধ্বনি হয়ে উঠতে পারে দ্রোহের একেকটি বুলেট।
আজকের পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু। আন্তর্জাতিক সহায়তার থালা হাতে তাদের নীতিনির্ধারকরা বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ান। আটার লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ যখন মারামারি করে রক্তাত্ব হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের কর্ণধারদের টনক নড়ে না। কিন্তু একজন প্রবীণ নারী যখন নারীর অধিকারের পক্ষে, সমতার পক্ষে রাজপথে পা রাখেন, কিংবা মঞ্চে দাঁড়িয়ে শরীরের ভাষায় শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র চাবুক চালান, তখন হঠাৎ করেই রাষ্ট্রের ঘুম ভেঙে যায়। বন্দুকের গর্জন, সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য আস্ফালন এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীদের তান্ডব যে রাষ্ট্রে পুরোপুরি সহনীয় ও স্বাভাবিক ব্যাপার, সেই রাষ্ট্রে নারীর পায়ের নূপুরের ধ্বনি কেন এত বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়? উত্তরটি খুব সহজ। কারণ সন্ত্রাস বা অস্ত্র কেবল ভৌত জীবন কেড়ে নেয়, কিন্তু শিল্প এবং সত্য মানুষের মগজ থেকে ভয়ের প্রাচীর গুঁড়িয়ে দেয়। আর একটি পতনমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভয় হলো সচেতন মানুষ। তারা চায় অনুগত, আজ্ঞাবহ, নির্বাক কিছু পুতুল, যারা প্রশ্ন করবে না, প্রতিবাদ করবে না, কেবল মাথা নিচু করে বেঁচে থাকবে। শিমা কেরমানিরা সেই মাথা নোয়ানোর সংস্কৃতিতে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতা যখনই নিজের ভঙ্গুরতা ঢাকতে চায়, তখনই সে সংস্কৃতির ওপর কোপ বসায়। কখনো মুখ ঢাকার ফতোয়া, কখনো নারীর কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার ফরমান, আবার কখনো বা মেধার টুঁটি টিপে ধরার অপচেষ্টা। কিন্তু ইতিহাস এও শিখিয়েছে যে, শৃঙ্খল দিয়ে মানুষের আত্মাকে কোনো দিনই বন্দি করা যায় না। ২০১২ সালের কথা মনে করুন। সেহওয়ানে লাল শাহবাজ কালান্দরের মাজারে যখন ধর্মীয় উগ্রবাদীদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় শত শত নিরীহ মানুষের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল প্রাঙ্গণ, তখন এই শিমা কেরমানিই ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। লাশের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, রক্তের দাগ শুকানোর আগেই তিনি পরিবেশন করেছিলেন সুফি ‘ধামাল’। সেই নৃত্য কেবল কোনো বিনোদন ছিল না; সেটি ছিল মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর এক দুর্দান্ত লড়াই। আজ সেই একই অকুতোভয় কণ্ঠকে যখন আইনি মারপ্যাঁচে কারাগারে বন্দি করার চেষ্টা করা হয়, তখন বোঝা যায় যে সেই ধামালের আগুন আজও শোষকদের মনে ভয়ের কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
এই ঘটনাকে যারা স্রেফ একটি সাধারণ বা বিচ্ছিন্ন পুলিশি পদক্ষেপ বলে উড়িয়ে দিতে চান, তাদের মানসিকতার গভীরেও রয়েছে এক ধরনের সুবিধাবাদী অন্ধত্ব। তারা সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পান। সমাজ সবসময়ই চায় একটি নিয়ন্ত্রিত, ফরমায়েশি ও তথাকথিত ‘ভদ্র’ সমাজ, যেখানে নারীরা ঘরের কোণে বন্দী থেকে কেবল হুকুম তামিল করবে। শিমা কেরমানি সেই বিষাক্ত ও পরাধীন নীরবতার দেওয়ালকে চিরতরে ভেঙে ফেলেছেন বলেই আজ তাঁকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অন্যদিকে, তথাকথিত সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে যারা এই গ্রেপ্তারের পেছনে যুক্তি খোঁজেন বা নির্লিপ্ত থাকেন, তারা হলেন ওই একই শোষক ব্যবস্থার এক অদৃশ্য সহচর। তাঁদের মুখে প্রগতিশীলতার বুলি মানায় না। তাঁরা যখন বলেন, “আরে এত রিয়্যাক্ট করার কী আছে, ওখানকার কালচারই তো এমন,” তখন বুঝতে হবে তাঁরা আসলে পরোক্ষভাবে অপরাধের পক্ষেই সাফাই গাইছেন। একটি নির্দিষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা বা আপস করা কোনোভাবেই প্রগতিশীলতা হতে পারে না।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই দ্বিচারিতা অত্যন্ত স্পষ্ট। সমাজের কোনো পুরুষ কি কখনো কেবল তার শরীরের ব্যবহার, তার ইচ্ছেমতো পোশাক পরা কিংবা নিজের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার জন্য রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বা গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছে? উত্তরটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই সত্যটি প্রকাশ্যে স্বীকার করার সাহস তথাকথিত কুলীন পুরুষদের নেই। কারণ এই সত্য স্বীকার করলেই তাদের শত বছরের সাজানো তাসের ঘর ধসে পড়বে। নারীবাদকে যারা উপহাসের পাত্র বানাতে চান, তাঁরা আসলে সেই সুবিধার বলয়ে বসবাস করেন যেখানে তাঁদের কখনো অস্তিত্ব রক্ষার জন্য রাজপথে নামতে হয় না, নিজের শরীর নিয়ে আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকতে হয় না কিংবা কতটা দৃশ্যমান হবেন আর কতটা আড়ালে থাকবেন তা নিয়ে ভাবতে হয় না। এই অন্ধ প্রিভিলেজই তাদের বিবেককে অসাড় করে রেখেছে। তাই যারা এখনও নারীবাদকে একটি বাড়াবাড়ি বা অপ্রয়োজনীয় আস্ফালন মনে করেন, তারা প্রকারান্তরে এই শোষিত ও অসুস্থ কাঠামোরই অংশীদার।
শিমা কেরমানির এই গ্রেপ্তারের ঘটনা আমাদের চোখের সামনে আরও একটি নির্মম সত্য উন্মোচন করেছে—তা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও নাগরিক সমাজের এক বিশাল অংশের নির্লিপ্ততা। বিশ্বজুড়ে যখন মাশা আমিনিতদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়, তখন আমাদের এই গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে চলার প্রবণতা চরম নৈতিক অবক্ষয়ের পরিচায়ক। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ভুলে যাই যে অন্যায় যেখানেই হোক না কেন, তা পরিধি পেরিয়ে একদিন আমাদের দোরগোড়ায় এসে কড়া নাড়বে। শিমা কেরমানি নিজের জন্য একা লড়াই করছেন না; তিনি লড়াই করছেন দক্ষিণ এশিয়ার সেই সমস্ত নারীর জন্য, যারা প্রতিদিন ঘরে-বাইরে অদৃশ্য নিগ্রহের শিকার হন। তাঁর এই অটল সাহসিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো কোনো অলৌকিক কিছু নয়, বরং সেটিই হওয়া উচিত মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা। কিন্তু পরাধীন ও দেউলিয়া মানসিকতার রাষ্ট্রে সেই স্বাভাবিক কাজটি করার জন্য যে পরিমাণ একাকী সংগ্রাম ও মূল্য দিতে হয়, তা আমাদের সমাজব্যবস্থার অসুস্থতারই প্রমাণ।
রাষ্ট্রযন্ত্রের এই অন্ধ দমনপীড়ন কেবল একজন শিল্পীকে অবরুদ্ধ করার চক্রান্ত নয়; এটি মূলত সেই বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন, যেখানে নারীর স্বাধীন সত্তাকে অস্বীকার করাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। যখনই কোনো সমাজ পরিবর্তনের হাওয়া দেখতে পায়, তখনই পুরনো ও জং ধরা শক্তিগুলো আরও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে। শিমা কেরমানি তাঁর দীর্ঘ শৈল্পিক ও রাজনৈতিক জীবনে বারবার প্রমাণ করেছেন যে শিল্প কেবল বিনোদনের খোরাক নয়, শিল্প হলো প্রতিরোধ এবং মুক্তির হাতিয়ার। করাচির সেই গ্রেপ্তারের রাতেই মূলত পতন ঘটেছে সেই সমস্ত নীতিবাগীশদের, যারা নিজেদের প্রগতিশীল দাবি করলেও সংকটের মুহূর্তে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেন না।
পরিশেষে বলতেই হয়, শিমা কেরমানিকে কারাগারে আটকে রেখে রাষ্ট্র হয়তো সাময়িক স্বস্তি পেতে পারে, কিন্তু তাঁর আদর্শের যে আগুন তিনি প্রজ্বালিত করে গেছেন, তা কোনো কারাগারে নিভিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। তাঁর এই গ্রেপ্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দেউলিয়া, ভীরু এবং দিশাহীন রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নৈতিক পরাজয়ের দলিল। যখন কোনো রাষ্ট্র শিল্পীকে ভয় পায়, নৃত্যশিল্পীর পায়ে বেড়ি পরাতে চায় এবং মুক্তবুদ্ধির মানুষকে কারাগারে পাঠায়, তখন ধরে নিতে হবে সেই রাষ্ট্রের পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। শিমা কেরমানি সেদিন পরাজিত হননি, পরাজিত হয়েছে সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা যা অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একটি মাত্র আলোর কণাকেও সহ্য করতে অক্ষম। সত্য ও সুন্দরের জয়যাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার সাধ্য কোনো কারাগার বা স্বৈরাচারী শাসকের নেই; আর ঠিক এই কারণেই শিমা কেরমানি এবং তাঁর মতো অকুতোভয় মানুষেরা যুগে যুগে আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়ে যান।
Tags :

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর কলাম

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশী তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষা ও আইসিটি উদ্যোক্তা এবং লেখক।

https://sufifaruq.com/

সর্বশেষ খবর