নির্বাচনের দিন এবং তার আগেপরে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ মাত্রার বল প্রয়োগ করা হতে পারে—তবে তা কখনোই আইনের সীমার বাইরে যাবে না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নির্ধারিত ও সুস্পষ্ট ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করবে। এ কথা জানিয়েছেন সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানের রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব, প্রস্তুতি ও কৌশল সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। তিনি বলেন, নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং তা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন জানান, কোনো নির্বাচনি কেন্দ্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সেনাবাহিনী ধাপে ধাপে বল প্রয়োগের নীতিমালা অনুসরণ করবে। প্রথমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা, এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী নন-লেথাল সরঞ্জাম ব্যবহার এবং সর্বশেষ পর্যায়ে সীমিত শক্তি প্রয়োগ—এই কাঠামোর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, হঠাৎ বা নির্বিচারে বল প্রয়োগ করা হবে না এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে আইন ও মানবাধিকার বিবেচনায়।
মব সহিংসতা, দলবদ্ধ হামলা কিংবা ভোটকেন্দ্র দখলের মতো সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং ফল ঘোষণার পর—সব পর্যায়েই সেনাবাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ও রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব এলাকা বরাবরই সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো সেনাবাহিনীর নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে। সেখানে পর্যাপ্ত সেনা মোতায়েন, টহল জোরদার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।
ভোটারদের আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবার উপজেলাভিত্তিক ও প্রয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্রভিত্তিক অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এর ফলে একসঙ্গে একাধিক টহল দল মাঠে কাজ করতে পারবে এবং দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ আরও জোরদার হবে।
নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি পেশাদার ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী। সেনাপ্রধানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী বাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করবে। কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই।
নির্বাচনকালীন প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীর গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো সংক্ষেপে নিচের ছকে উপস্থাপন করা হলো—
| প্রস্তুতির ক্ষেত্র | বিবরণ |
|---|---|
| মোতায়েন পরিকল্পনা | উপজেলাভিত্তিক ও কেন্দ্রভিত্তিক ক্যাম্প স্থাপন |
| ঝুঁকি মূল্যায়ন | নির্বাচন পূর্ব, চলাকালীন ও পরবর্তী থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট |
| সরঞ্জাম | নন-লেথাল অস্ত্র ও রায়ট কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট |
| টহল ব্যবস্থা | নিয়মিত ও বর্ধিত মোবাইল পেট্রোল |
| সমন্বয় | বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম |
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন জানান, নির্বাচনকে ঘিরে সাইবার গুজব, ভুয়া তথ্য ও উসকানিমূলক প্রচারণা প্রতিরোধেও সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে আইনসম্মত, সংযত ও পেশাদার আচরণের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষা এবং একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান অঙ্গীকার।
