খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুন ২০২৬, ৮:২৮ পিএম

নওগাঁ শহরে একই দিনে রাসায়নিক স্প্রে প্রয়োগ করে দুটি চাঞ্চল্যকর প্রতারণার ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ বা স্কোপোলামিন নামে পরিচিত চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই অভিনব ও মারাত্মক প্রতারণার শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক বৃদ্ধার মৃত্যুও হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের কাছ থেকে চক্রের হাতিয়ে নেওয়া স্বর্ণালংকারের একটি অংশ গলানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
রবিবার (২৮ জুন) দুপুরে নওগাঁ জেলা পুলিশ লাইন্সের এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ জুন নওগাঁ সদর থানা এলাকায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক দুটি প্রতারণার ঘটনা ঘটে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শহরের চুরিপট্টি এলাকার নওগাঁ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে। সেখানে ফাতেমা বেগম (৭০) নামে এক বৃদ্ধাকে টার্গেট করে চক্রের কয়েকজন সদস্য। তারা কথায় কথায় বৃদ্ধার চোখে-মুখে বিশেষ রাসায়নিক স্প্রে করে তাঁকে পুরোপুরি অচেতন ও সম্মোহিত করে ফেলে।
এরপর কৌশলে তাঁকে একটি রিকশায় তুলে তাঁর গলায় থাকা স্বর্ণের চেইন, কানের দুল ও নগদ পাঁচ হাজার টাকা লুটে নেয়। পরে অবশ ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ওই বৃদ্ধাকে ডিগ্রির মোড় এলাকার একটি ডাস্টবিনের পাশে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তারা। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৫ জুন ওই বৃদ্ধা মারা যান।
একই দিন অপর একটি ঘটনায়, নিজের ছেলের বাড়িতে যাওয়ার পথে নওগাঁ-ঢাকা বাসস্ট্যান্ড থেকে লিটন ব্রিজের মাঝামাঝি এলাকায় পৌঁছান এক বৃদ্ধ দম্পতি। সেখানে চক্রের সদস্যরা তাঁদের গতিরোধ করে এবং একটি চকচকে নকল স্বর্ণের বার দেখিয়ে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে। একপর্যায়ে তাদের ওপরও রাসায়নিক স্প্রে প্রয়োগ করে সম্মোহিত করা হয়। দম্পতিটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁদের কাছ থেকে প্রায় ছয় আনা ওজনের একজোড়া স্বর্ণের কানের দুল হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দেয় প্রতারকেরা।
পরপর দুটি স্পর্শকাতর ঘটনার পর নওগাঁ সদর মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম), সদর মডেল থানা এবং জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করা হয়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় শনিবার (২৭ জুন) গভীর রাত পর্যন্ত নওগাঁ শহরের ৯টি আবাসিক হোটেল ও বিভিন্ন সন্দেহভাজন এলাকায় একযোগে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। অভিযানে শহরের ‘নওগাঁ রেস্ট হাউস’ হোটেলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গাইবান্ধা জেলার বাসিন্দা আব্দুল হাই, এরশাদ আলী ও বাবলু এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার মো. কালামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে গ্রেপ্তার চার আসামিকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা অপরাধ স্বীকার করে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই সোনা কেনার অভিযোগে নওগাঁ স্বর্ণপট্টির ‘মুহিব জুয়েলার্স’-এর ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীরকেও আটক করা হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানান, তারা মূলত একটি সংঘবদ্ধ দলের সদস্য। দলের আরও দুই-তিনজন সহযোগীসহ তারা বিভিন্ন জনাকীর্ণ এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। সোনা বা অন্য কোনো মূল্যবান জিনিসের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রথমে কাছে ডাকতেন, এরপর সুকৌশলে রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করে তাঁদের অবশ করে মুহূর্তের মধ্যে সর্বস্ব লুটে নিতেন।
তদন্তে জানা গেছে, বৃদ্ধ দম্পতির কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া স্বর্ণের কানের দুলটি তারা মুহিব জুয়েলার্সে বিক্রি করেছিল। ম্যানেজার জাহাঙ্গীর চোরাই সোনা কেনার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, চুরির প্রমাণ নষ্ট করতে তিনি কানের দুলটি দ্রুত গলিয়ে ফেলেছিলেন। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গলানো অবস্থায় চার আনা সোনা উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই ম্যানেজার আগেও এমন চোরাই সোনা কেনাবেচার সাথে জড়িত ছিলেন।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “জেলা পুলিশের সমন্বিত ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণে এই বিপজ্জনক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। লুট হওয়া বাকি স্বর্ণালংকার ও অর্থ পলাতক সহযোগীদের কাছে রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার এবং অবশিষ্ট মালামাল উদ্ধারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।” তিনি সাধারণ মানুষকে রাস্তায় চলাচল বা ভ্রমণের সময় অপরিচিত কোনো ব্যক্তির প্রলোভনে পা না দেওয়ার এবং অদ্ভুত কোনো গন্ধ বা স্প্রে থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
মন্তব্য