জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

দেশে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড

রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়েকে যেভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, সেই ভয়ংকর স্মৃতি এখনো সাধারণ মানুষের বুক কাঁপিয়ে তোলে। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত জুনে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ঘটে যায় আরেকটি অত্যন্ত লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড। গত ২৫ জুন সংঘটিত সেই বর্বরোচিত ঘটনায় রাতের আঁধারে এক মা ও তাঁর তিন তরুণী মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে এক যুবক। নরপিশাচের হাতে প্রাণ হারানো সেই হতভাগ্য মা ছিলেন শাহিনুর বেগম এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার, ইকরা ও সিপা। এই পৈশাচিক ঘটনার তীব্রতা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছিল।
তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, রংপুর কিংবা লক্ষ্মীপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের গভীর উদ্বেগের মুখে ফেলে দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক ঘটছে এমন লোমহর্ষক পারিবারিক হত্যাকাণ্ড। পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসের ব্যবধানে—চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্টের মধ্যে—দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে নির্বিচারে হত্যার অন্তত ১৮টি বড় ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব বর্বরোচিত ও মর্মান্তিক ঘটনায় নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি মিলিয়ে ঝরে গেছে অন্তত ৪৭টি তাজা প্রাণ।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করতে গেলে দেখা যায়, এসব অপরাধের ধরনও বেশ ভিন্ন ও রোমহর্ষক। কোনো কোনো ঘটনায় আক্রোশ মেটাতে এক পরিবারের দুজনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও তিনজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে, আবার কোথাও চার থেকে পাঁচজন সদস্যকে একসঙ্গে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। একটি সভ্য সমাজে ঘরের ভেতরে বা আপনজনদের মাধ্যমে এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হওয়া মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ এখন নিজের ঘরেও নিরাপদ বোধ করতে পারছেন না।
সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মতে, একের পর এক এমন ঘটনার পেছনে কাজ করছে গভীর সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তির লোভ, পরকীয়া কিংবা চরম হতাশা। মানুষ এখন ধৈর্য হারাচ্ছে এবং তুচ্ছ কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে চরম হিংস্র হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কিংবা অপরাধের দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এই ধরনের পারিবারিক সহিংসতা রোধ করতে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাই যথেষ্ট নয়, বরং এর মূলে থাকা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া এই অন্ধ হিংস্রতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও বেশি হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।
Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর