সরকারি পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করার পরও দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহসংকট কাটেনি। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ভোক্তাদের বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। ফলে প্রতিটি সিলিন্ডারে ভোক্তাদের অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৪৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা।
এলপিজি পরিবেশকদের দাবি, বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করছে। তাদের কাছ থেকেও চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন, শ্রমিক, গুদাম ভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করে তাঁদের লোকসান হচ্ছে। পরিবেশক পর্যায়ে কমিশন বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বলছে, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এসব খরচ সমন্বয়ের সুযোগ নেই।
নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি
গত ৪ অক্টোবর এলপিজির নতুন মূল্য ঘোষণা করে বিইআরসি। সংস্থাটির নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী, গত মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবরের জন্য তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে নির্ধারিত দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা।
তবে সরকারি মূল্য সমন্বয়ের পরও বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এতে রান্নার জ্বালানির ব্যয় বেড়ে সরাসরি চাপ পড়ছে পারিবারিক বাজেটে।
রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা তামান্না আখতার গত বুধবার বাসায় ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার নেন। এর জন্য তাঁকে দিতে হয় ২ হাজার ৫০০ টাকা। পরদিন বৃহস্পতিবার তিনি জানান, সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় তাঁকে ৬৬৩ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ নেই, সেসব পরিবারের রান্নার প্রধান জ্বালানি হওয়ায় এলপিজির দাম ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে।
কমিশন বাড়ানোর দাবি পরিবেশকদের
বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি এবং পরিবেশক পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে গত ৬ অক্টোবর বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি। সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে পরিবেশকদের ব্যয় ও কমিশন পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, বিইআরসি নতুন দাম ঘোষণার দিন সন্ধ্যা থেকেই বিভিন্ন এলপিজি কোম্পানি নিজস্ব মূল্যতালিকা প্রকাশ করে। এসব তালিকায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, লাইসেন্স ফি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছে সমিতি।
সমিতির হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানির কাছ থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত একটি সিলিন্ডার আনতে পরিবহন ব্যয় হয় ৫০ টাকা। সিলিন্ডার ট্রাকে ওঠানো-নামানো এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে খরচ হয় আরও ৩৫ টাকা। কর্মচারীদের বেতন, গুদাম ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য খাতে লাগে ২৫ টাকা। এর সঙ্গে প্রতি সিলিন্ডারে ৪০ টাকা মুনাফা প্রয়োজন বলে দাবি তাদের।
সব মিলিয়ে পরিবেশক পর্যায়ে প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে পরিবেশকেরা সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন পেয়ে আসছেন। ফলে তাঁদের হিসাবে, প্রয়োজনীয় ব্যয় ও মুনাফার তুলনায় প্রতি সিলিন্ডারে ১০০ টাকার ঘাটতি রয়েছে।
সমিতির মতে, বিভিন্ন কোম্পানির মূল্যতালিকায় পার্থক্য এবং সরবরাহের অনিয়ম বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের ন্যায্য স্বার্থের পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে।
গণশুনানি ছাড়া খরচ সমন্বয় সম্ভব নয়: বিইআরসি
পরিবেশকদের কমিশন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ানোর দাবির বিষয়ে বিইআরসি জানিয়েছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৭৪২ টাকা। পরিবেশকেরা সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন পান। সে হিসাবে তাঁদের খুচরা বিক্রেতার কাছে ১ হাজার ৭৯২ টাকায় সিলিন্ডার সরবরাহ করার কথা।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির চিঠি তাঁরা পেয়েছেন। তবে গণশুনানি ছাড়া এসব ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ নেই। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে আগামী রোববার কমিশনের সভায় আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। নতুন সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। তখনই পরিবেশকদের জন্য সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রায় পাঁচ বছর ধরে একই হারে কমিশন দেওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলানো যাচ্ছে না বলে দাবি পরিবেশকদের।
তবে কমিশন বাড়ানোর দাবির পাশাপাশি বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে এবং বিক্রয়মূল্য কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হয়।
আমদানি স্বাভাবিক, তবু সরবরাহে ঘাটতি
বাংলাদেশে এলপিজির বাজার মূলত বেসরকারি আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার টন।
এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংগঠনটির বক্তব্য, দেশে এলপিজি আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ পুরো বাজারে ছড়িয়ে দিতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে, পরিবেশকেরা বলছেন, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকটি কোম্পানি সরবরাহ কমাতে শুরু করেছে। তাঁদের দাবি, বর্তমানে মেঘনা ফ্রেশ, ওমেরা, আইগ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স ও বিএম নিয়মিত এলপিজি সরবরাহ করছে। এসব কোম্পানি নির্ধারিত দামে পণ্য দিচ্ছে বলে তাঁদের বক্তব্য। অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মাঝেমধ্যে অল্প পরিমাণে সরবরাহ করছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি দাম নিচ্ছে।
পরিবেশকদের অভিযোগ, কিছু কোম্পানি নিয়মিত এলপিজি সরবরাহ না করলেও ১২ কেজির সিলিন্ডারের জন্য ১ হাজার ৯৬০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যতালিকা দিয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত পণ্য সংগ্রহ করতে না পেরে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে।
তবে আমদানি স্বাভাবিক থাকার দাবি এবং বাজারে পণ্য না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট নয়। আমদানি করা এলপিজি কীভাবে বিভিন্ন কোম্পানি, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে বাজারে পৌঁছাচ্ছে, সেই সরবরাহব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবহন খাতেও সংকটের প্রভাব
এলপিজির ঘাটতি শুধু গৃহস্থালি রান্নার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। এলপিজি ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির মহাসচিব হাসিন পারভেজ প্রথম আলোকে বলেন, একটি স্টেশনে মাসে যেখানে ৩০ টন এলপিজির চাহিদা থাকে, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ টন। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় বিক্রি কমেছে এবং স্টেশনগুলো লোকসানের মুখে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এলপিজিচালিত যানবাহনের চালক ও মালিকদের পরিচালন ব্যয়েও প্রভাব পড়তে পারে। তবে সরবরাহের ঘাটতি কত দিন স্থায়ী হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া যায়নি।
এক কোটি গ্রাহকের জ্বালানি এলপিজি
সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ গৃহস্থালি রান্নার কাজে এই জ্বালানি ব্যবহার করেন। ২০১৫ সালে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ হওয়ার পর থেকে এলপিজির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা ১৫ লাখ টনের বেশি।
এলপিজি এখন শুধু রান্নার জ্বালানি নয়; বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পরিবহন খাতেও এর ব্যবহার রয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিলে একাধিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বেসরকারি খাতের ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল এই বাজারে আমদানি, মজুত, পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা জরুরি।
বাড়তি দাম ঠেকাতে সারা দেশে অভিযান
এলপিজির অতিরিক্ত দাম নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সারা দেশে অভিযান চালাচ্ছে। অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানান, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সিলিন্ডার গ্যাসের বিক্রি তদারকিতে ২৪২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ের ৪৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
গত দুই দিনেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত ছিল বলে জানান তিনি।
তবে অভিযানের পাশাপাশি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কোম্পানি থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখাও জরুরি। শুধু জরিমানা করে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কিংবা পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের মধ্যে অসংগতি থাকলে ভোক্তাদের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে পরিবেশকেরা কমিশন বাড়ানোর দাবি তুলেছেন, অন্যদিকে ভোক্তারা নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা চাইছেন। বিইআরসির পরবর্তী সভায় ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব নিয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, তার ওপর এই সংকট মোকাবিলার পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করবে। এর মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো, কোম্পানিগুলোর মূল্যতালিকার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত দামে বিক্রি কার্যকরভাবে তদারক করাই ভোক্তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি।








