গ্যাসের সংকটে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দিন-রাত দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করছেন চালকেরা। এতে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, কমছে দৈনিক আয়, আবার গাড়ির মালিককে নির্ধারিত জমার টাকা দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও সংসারের খরচ বহন করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন অনেক চালক।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশন ঘিরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কোথাও স্টেশনের ভেতর থেকে সড়ক পর্যন্ত গাড়ির সারি দেখা গেছে। আবার অনেক স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ধীরগতিতে যানবাহনে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছিল। ফলে একটি গাড়িতে গ্যাস দেওয়া শেষ হওয়ার পরও পেছনে অপেক্ষমাণ গাড়ির দীর্ঘ সারি দ্রুত কমছিল না।
হাজীপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশন, আর এস সিএনজি স্টেশন, সিটিজেন সিএনজি অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম ফিলিং স্টেশন, ইন্ট্রাকোসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার স্টেশনগুলোতে চালকদের একই ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে যে কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে আয় করার কথা, তার বড় একটি অংশ এখন জ্বালানি সংগ্রহে ব্যয় হচ্ছে। কোনো কোনো চালককে দিনে দুইবার পর্যন্ত স্টেশনে ফিরতে হচ্ছে। একবার গ্যাস নেওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আবার গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে যাত্রী পরিবহনের সময় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে চালকদের শ্রম ও অতিরিক্ত খরচ।
মগবাজার এলাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, গ্যাসের জন্য প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও অনেক সময় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যায় না। ফলে রাস্তায় বের হওয়ার পর বেশিক্ষণ গাড়ি চালানো সম্ভব হয় না। অথচ গাড়ির মালিককে প্রতিদিন নির্ধারিত টাকা জমা দিতে হয়।
আরেক চালক রাইসুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন গাড়ির মালিককে ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। কিন্তু গ্যাস নিতে তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কম চাপের কারণে কখনও কখনও ১০০ থেকে ১২০ টাকার বেশি গ্যাসও নেওয়া সম্ভব হয় না। এরপর তিন-চার ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আবার স্টেশনে ফিরতে হচ্ছে। এতে আয় কমে গেছে, সংসারের খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্যাসের এই সংকটের প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের ওপরও। দীর্ঘ সময় স্টেশনে আটকে থাকার কারণে অনেক সিএনজি অটোরিকশা রাস্তায় নামতে পারছে না। ফলে যাত্রীরা প্রয়োজনের সময়ে পর্যাপ্ত গাড়ি পাচ্ছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকল্প পরিবহন নিতে হচ্ছে, যা সময় ও ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকেরাও সমস্যায় পড়েছেন। বেইলি রোডের বাসিন্দা রহমান শরীফ বলেন, গ্যাস নিতে এসে এক থেকে দুই ঘণ্টা, কখনও তারও বেশি সময় লাইনে থাকতে হচ্ছে। অফিস কিংবা জরুরি কাজে যাওয়ার সময় পাম্পে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকলে পুরো সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যায়। আগে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্যাস নিয়ে বের হওয়া গেলেও এখন কখন গ্যাস পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত নয়। তাই অনেক সময় গাড়ি রেখে রাইড শেয়ারিং বা সিএনজি অটোরিকশায় করে অফিসে যেতে হচ্ছে।
এদিকে গ্যাস সরবরাহের সামগ্রিক পরিস্থিতিতেও চাপের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩২ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১৬২ কোটি এবং এলএনজি থেকে ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। একই দিন সকাল ৫টা ৫৪ মিনিটে ‘মারান গ্যাস অলিম্পিয়াস’ নামের আরামকোর এলএনজিবাহী একটি কার্গো সামিট টার্মিনালে যুক্ত হয়।
গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও দেখা যাচ্ছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় জাতীয় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১৪ হাজার ৬৬০ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে ঘাটতি ছিল ৩৭৮ মেগাওয়াট।
দিনের শুরুতে ঘাটতি ছিল আরও বেশি। সকাল ৬টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮১৯ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৭১৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার ১০২ মেগাওয়াটে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ১টায় লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৮১ মেগাওয়াট।
এর মধ্যে ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় ওই কেন্দ্র থেকে প্রকৃত বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ৭৫৪ মেগাওয়াট। ওই সময়ে সরবরাহ পাওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট।
বাড়ানোর পরিকল্পনা এলএনজি অবকাঠামো
দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে মহেশখালীতে দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার তৃতীয় ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) চালুর লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ীতে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শুক্রবার জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত ‘১৫তম এলএনজি প্রোডিউসার-কনজ্যুমার কনফারেন্স ২০২৬’-এ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিকল্পনা তুলে ধরে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এসব তথ্য জানান।
দীর্ঘমেয়াদি এসব অবকাঠামো চালু হলে গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে বর্তমান সংকটে রাজধানীর চালকদের প্রতিদিনের বাস্তবতা এখন দীর্ঘ সারি, সীমিত জ্বালানি এবং কমে যাওয়া আয়। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এর চাপ নগর পরিবহনব্যবস্থা ও যাত্রীদের দৈনন্দিন চলাচলেও আরও স্পষ্টভাবে পড়তে পারে।









