ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার ২৫ দিন পর রাশেদুল ইসলাম (১৯) নামের এক তরুণের কঙ্কাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। চন্দ্রপুর গ্রামের ‘গারোর ভিটা’ এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তাঁর বলে ধারণা করা কঙ্কাল, মাথার খুলি, বিভিন্ন হাড় এবং পরনের প্যান্ট ও গেঞ্জি উদ্ধার করা হয়। পোশাক দেখে কঙ্কালটি নিজের ছেলে রাশেদুলের বলে শনাক্ত করেছেন তাঁর বাবা মো. শাহজাহান।
রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব উদ্ধার করে। রাশেদুল ফুলপুর উপজেলার কৃষ্ণ মহেশপট্টি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি বাবার সঙ্গে ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন। তবে ইটভাটায় কাজ না থাকায় প্রায় দেড় মাস ধরে বাড়িতে ছিলেন। এ সময় পাশের এলাকার তিন যুবকের সঙ্গে তাঁর চলাফেরা ও আড্ডা বাড়ে। তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক হিসেবেও কাজ করতেন তিনি।
রাশেদুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা শুরু হয় গত ১২ আগস্ট রাতে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানিয়েছে, রাত নয়টার দিকে মুঠোফোনে রাশেদুলকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান জসিম উদ্দিন (২৪)। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন সকালে রাশেদুলের মুঠোফোন নম্বর থেকে তাঁর বাবা শাহজাহানের কাছে একটি ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্তে এক নারীর কণ্ঠে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। দুই ঘণ্টার মধ্যে টাকা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এরপর কয়েক দফায় ফোন ও খুদেবার্তাও পাঠানো হয়। ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে ওই দিনই ফুলপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন শাহজাহান।
ঘটনার পর জসিম এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে ২৫ আগস্ট ফুলপুর থানায় অপহরণের মামলা করা হয়। মামলায় জসিমকে প্রধান আসামি করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছিল।
মামলার তদন্ত এগোতে থাকলে রোববার দুপুরে নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জ রেলস্টেশন এলাকা থেকে জসিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে একই এলাকার রফিক (২৮) ও মোজাম্মেল হোসেন (২৭) নামের আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, এই তিনজনই রাশেদুলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।
জসিমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার রাতে চন্দ্রপুর গ্রামের ‘গারোর ভিটা’ এলাকার জঙ্গলে অভিযান চালানো হয়। সেখানে মাটির বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা হাড়, একটি মাথার খুলি এবং পোশাক পাওয়া যায়। পরে রাশেদুলের বাবা পোশাক দেখে কঙ্কালটি তাঁর ছেলের বলে শনাক্ত করেন।
রাশেদুলের বাবা শাহজাহানের ভাষ্য, নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে রাশেদুল, রফিক ও মোজাম্মেল একসঙ্গে একটি শসাখেতে শ্রমিকের কাজ করেছিলেন। কাজ শেষে রফিক ৫০০ টাকা পারিশ্রমিক পেলেও রাশেদুলকে দেওয়া হয়েছিল ১০০ টাকা। শাহজাহানের অভিযোগ, বাকি টাকা দিয়ে রফিক মাদক কিনে সেবন করেন। পরে রাশেদুলের মুঠোফোন নষ্ট হয়ে গেলে পাওনা টাকা নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। সেই বিরোধের জেরেই রাশেদুলকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার তিনজন রাশেদুলকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা বলেছে। তবে তাঁদের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় একেকজন একেক ধরনের তথ্য দিচ্ছেন। ফলে হত্যার প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে প্রত্যেকের ভূমিকা এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফুলপুর থানার উপপরিদর্শক জিকরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শ্বাসরোধে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। আসামিদের বক্তব্য যাচাইসহ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে উদ্ধার করা হাড়ের অংশগুলো ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানোর কথা রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কঙ্কালের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে ময়নাতদন্ত ও তদন্তে পাওয়া তথ্য থেকে মৃত্যুর ধরন এবং ঘটনার বিস্তারিত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার আশা করছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। রাশেদুলের আকস্মিক নিখোঁজ হওয়া, মুক্তিপণের দাবি, পরে তাঁর কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো হত্যার প্রকৃত কারণ, ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি এবং এতে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা নিশ্চিত করা।










