রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীর টানে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে এক শিক্ষিকার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহত মোসা. রনজিনা পারভীন বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে চোখ দেখাতে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে তার প্রাণহানি ঘটে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, রনজিনা পারভীন রাতে বগুড়া থেকে বাসে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ভোরে তিনি গাবতলী বাস টার্মিনালে পৌঁছান। সেখান থেকে রিকশায় করে ফার্মগেট এলাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাচ্ছিলেন তিনি।
রিকশাটি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে পৌঁছানোর পর পেছন দিক থেকে মোটরসাইকেলে করে এক ব্যক্তি এগিয়ে আসে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারী রনজিনা পারভীনের হাতে থাকা ব্যাগটি টান দিয়ে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। হঠাৎ জোরে টান দেওয়ায় তিনি রিকশার ওপর ভারসাম্য রাখতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যেই সড়কের ওপর পড়ে যান ওই শিক্ষিকা।
সড়কে পড়ে যাওয়ার সময় তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। মাথা ফেটে গিয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রনজিনা পারভীনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার কর্মস্থল ও স্বজনদের মধ্যে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি বগুড়ার বিদ্যালয়টিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা তার এই সফর শেষ পর্যন্ত এমন মর্মান্তিক পরিণতি নেবে, তা কেউই ভাবতে পারেননি।
ঘটনার পর ছিনতাইকারী ও ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্তে তৎপর হয়েছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। দ্রুত তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ।
তদন্তের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলের আশপাশের নিরাপত্তা ক্যামেরার ধারণ করা দৃশ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। মোটরসাইকেলটির গতিপথ, ছিনতাইকারীর চেহারা বা পোশাক এবং ঘটনার সময় সেখানে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করে পুলিশ এগোতে পারে। একই সঙ্গে ছিনতাইয়ের সময় ব্যাগটি কীভাবে টানা হয়েছিল এবং রনজিনা পারভীন ঠিক কোন পরিস্থিতিতে রিকশা থেকে পড়ে যান, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজধানীতে চলন্ত রিকশা বা অন্যান্য যানবাহন থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এ ধরনের ছিনতাইয়ে শুধু অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী হারানোর ঝুঁকিই থাকে না, যাত্রীর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গুরুতর দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীরা পেছন থেকে এসে ব্যাগ টান দিলে আক্রান্ত ব্যক্তি আচমকা রাস্তায় পড়ে যান। আশপাশে অন্য যানবাহন থাকলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
রনজিনা পারভীনের ঘটনাতেও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে সরাসরি তার পড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে ঘটনার প্রতিটি দিক যাচাই না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে কোনো সিদ্ধান্তে যেতে চাইছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জাতীয় সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি এমন ঘটনা ভোরের সময় নিরাপত্তা ও ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। দিনের শুরুতেই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে হাসপাতালে যাওয়া এক নারী এভাবে প্রাণ হারানোয় নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পুলিশের তদন্তে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার বিস্তারিত কারণ সামনে আসার অপেক্ষায় রয়েছে নিহতের পরিবার ও স্বজনরা। একই সঙ্গে রনজিনা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা।









