গজল, ঠুমরি কিংবা দাদরা—যে গানই তিনি গেয়েছেন, তাতেই মিশে গেছে আবেগ, বেদনা ও গভীর মানবিক অনুভূতি। তাঁর কণ্ঠে বিরহ পেয়েছে কোমল বিষণ্নতা, প্রেম হয়ে উঠেছে আকুল অপেক্ষা, আর অভিমান যেন নিঃশব্দ অশ্রুর মতো ঝরে পড়েছে সুরের ভাঁজে। তিনি বেগম আখতার—উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় ও আধা-শাস্ত্রীয় সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, যিনি ‘মালিকা-এ-গজল’ বা গজলের সম্রাজ্ঞী হিসেবে আজও স্মরণীয়।
বেগম আখতারের প্রকৃত নাম ছিল আখতারি বাঈ ফৈজাবাদি। ১৯১৪ সালের ৭ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। মাত্র সাত বছর বয়সে মঞ্চে আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রা। পরে তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত ওস্তাদদের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নেন। পাটিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ আতা মোহাম্মদ খান এবং কিরানা ঘরানার ওস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খানের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা তাঁর গায়কির ভিতকে আরও শক্তিশালী করে।
শৈশব ও কৈশোরের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আখতারি বাঈ ধীরে ধীরে নিজের স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তা গড়ে তোলেন। তাঁর কণ্ঠে যেমন ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীর অনুশীলনের ছাপ, তেমনি ছিল সাধারণ শ্রোতার অনুভূতিতে সরাসরি পৌঁছে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। ঠুমরি ও দাদরায় পুরব ও পাঞ্জাবি সংগীতধারার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে তিনি নিজের গায়কির সঙ্গে মিশিয়ে এক অনন্য পরিবেশনরীতি তৈরি করেছিলেন।
তবে তাঁর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে গজলের সঙ্গে। কবিতার প্রতিটি শব্দকে তিনি কেবল সুরে বাঁধতেন না, তার অন্তর্নিহিত আবেগও কণ্ঠে ধারণ করতেন। মির্জা গালিবসহ বহু খ্যাতিমান কবির লেখা তাঁর কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা, নিঃসঙ্গতা কিংবা অভিমান—মানুষের মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো তাঁর গানে এমনভাবে ফুটে উঠত যে শ্রোতার কাছে তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মতো মনে হতো।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও তাঁর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে তিনি কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ‘মুমতাজ বেগম’, ‘নসীব কা চক্কর’, ‘রোটি’, ‘পন্না দাই’ ও ‘দানা পানি’সহ বিভিন্ন ছবিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের চেয়ে সংগীতই তাঁর জীবনের প্রধান সাধনায় পরিণত হয়।
১৯৪৪ সালে লখনউয়ের ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ আব্বাসির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর কিছু সময় তিনি নিয়মিত গান থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু সংগীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৪৮-৪৯ সালের দিকে অল ইন্ডিয়া রেডিওর মাধ্যমে তিনি আবার শ্রোতাদের সামনে ফিরে আসেন। সেই প্রত্যাবর্তন তাঁর সংগীতজীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
রেডিওর বিস্তারের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ আরও বৃহত্তর শ্রোতৃমহলে পৌঁছে যায়। তাঁর গায়কির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আবেগের সংযত প্রকাশ। অতিরিক্ত নাটকীয়তা ছাড়াই তিনি একটি গানের ভেতরের বেদনা কিংবা আকাঙ্ক্ষাকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে পারতেন। এ কারণেই তাঁর গান কেবল সংগীতপ্রেমীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; সাধারণ শ্রোতার কাছেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন আপনজনের মতো।
বাংলাভাষী শ্রোতাদের কাছেও বেগম আখতারের আলাদা একটি জায়গা রয়েছে। ‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার’ এবং ‘জোছনা করেছে আড়ি’র মতো বাংলা গান তাঁর কণ্ঠে বিশেষ আবেগময়তা পেয়েছে। তাঁর গায়কির মায়াময় আবেদন ভাষার সীমা অতিক্রম করেছিল। ফলে বাংলা ভাষার শ্রোতাদের কাছে তিনি শুধু একজন গজলশিল্পী নন, বরং স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও বিষণ্ন সৌন্দর্যের এক অনন্য নাম।
শিল্পী হিসেবে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মানের মাধ্যমে। ১৯৬৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৭২ সালে তিনি সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। মৃত্যুর পর ১৯৭৫ সালে তাঁকে মরণোত্তর পদ্মভূষণ দেওয়া হয়।
জীবনের শেষ সময়েও সংগীত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি বেগম আখতার। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে একটি সংগীতানুষ্ঠানে পরিবেশনের সময় নিজের গানে পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি আরও জোর দিয়ে গাইতে থাকেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। এর পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তাঁর শেষ পরিবেশনা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে স্থান ও তারিখের কিছু পার্থক্য থাকলেও, ১৯৭৪ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে আহমেদাবাদে অসুস্থ হওয়ার পর ৩০ অক্টোবর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর।
একজন শিল্পীর জীবন শেষ হয়েছিল, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থামেনি।
বেগম আখতারের গান পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। গজলকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছিলেন, উচ্চাঙ্গ সংগীতের গভীরতা বজায় রেখেও কীভাবে কবিতার আবেগকে সহজে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া যায়।
আজও তাঁর গান শুনলে মনে হয়, বহু পুরোনো কোনো জলসাঘর থেকে ভেসে আসছে এক পরিচিত কণ্ঠ। সেই কণ্ঠে আছে প্রেমের আকুলতা, বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস, অপেক্ষার নিঃসঙ্গতা আর জীবনের প্রতি গভীর মমতা।
বেগম আখতার চলে গেছেন বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি। বরং প্রতিটি প্রজন্মে তাঁর গান নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছে।
গজলের সেই সম্রাজ্ঞীর কণ্ঠ থেমেছে, কিন্তু তাঁর সুর থামেনি। তাঁর গান আজও শ্রোতার হৃদয়ে একইভাবে অনুরণিত হয়। আর তাই ‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার’ শুধু একটি গান নয়—বেগম আখতারের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগের নাম।
প্রয়াণদিবসে তাই তাঁকে স্মরণ মানে শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং এমন এক কণ্ঠকে স্মরণ করা, যে কণ্ঠ প্রেম, বিরহ ও মানুষের অন্তর্গত বেদনার জন্য এক স্থায়ী ভাষা তৈরি করে গেছে।









