চট্টগ্রামের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া-কুমিরা নৌরুটে সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির প্রতিবাদে আচমকা স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রাখা হয়। আর এই ধর্মঘটের বলি হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় সময়মতো চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছাতে পারেননি বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন (৭০)। উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে ঘাটে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহত বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন সন্দ্বীপ উপজেলার গাছুয়া ইউনিয়নের কাসেম মার্কেট সংলগ্ন রহমতেরগো বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা। পরিবারের স্বজনরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি মারাত্মক লিভারজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। মঙ্গলবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে দ্রুত স্থানীয় গাছুয়া স্বাস্থ্য প্রকল্পে ভর্তি করানো হয়। তবে সকালে অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে কালবিলম্ব না করে চট্টগ্রাম মেডিকেল বা শহরের কোনো হাসপাতালে স্থানান্তরের জোর পরামর্শ দেন।
চিকিৎসকদের পরামর্শে পরিবারের সদস্যরা অতি দ্রুত রোগীকে নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু গুপ্তছড়া ঘাটে পৌঁছানোর পর তারা চরম বিপাকে পড়েন। দীর্ঘ সাত দিন ধরে চলা বৈরী আবহাওয়ার সতর্ক সংকেত বুধবার সকালে প্রত্যাহার করা হলেও ঘাটে চট্টগ্রামগামী কোনো নৌযানের দেখা মেলেনি। মূলত কাউন্টারে দুষ্কৃতকারীদের চাঁদাবাজি এবং ঘাটকর্মীদের নিরাপত্তার অভাবে কুমিরা-গুপ্তছড়া রুটে হঠাৎ করেই স্পিডবোট চলাচল স্থগিত রাখে ইজারাদার কর্তৃপক্ষ। ফলে মুমূর্ষু রোগীসহ শত শত সাধারণ যাত্রী ঘাটে এসে আটকা পড়েন।
নিহতের ভাতিজা রেজাউল করিম অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান, সকাল ৯টার দিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তার চাচাকে তারা ঘাটে নিয়ে যান। তবে সেখানে পৌঁছে শোনেন চাঁদাবাজির প্রতিবাদে স্পিডবোট বন্ধ রাখা হয়েছে। ওই সময় সাগরে ভাটা চলায় ফেরি, স্টিমার কিংবা সাধারণ কোনো মালবাহী নৌযান ছাড়ারও সুযোগ ছিল না। জীবন-মৃত্যুর সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা নৌযানের আশা ও আকুতি জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। অবশেষে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঘাটের ট্রলি ও খাটেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন।
সন্দ্বীপের এই নৌরুটে স্পিডবোট পরিচালনাকারী বিআইডব্লিউটিএ অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান আদিল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জগলুল হোসেন নয়ন বোট বন্ধ রাখার কারণ হিসেবে চাঁদাবাজির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার দাবি, গত কয়েক দিন ধরে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা গুপ্তছড়া ঘাটের কাউন্টারে এসে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিচ্ছে ও কর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। চালক ও কর্মচারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিডবোট চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএ-এর উপপরিচালক নয়ন শীল জানান, এটি মূলত ইজারাদারের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে ঘটেছে। যাত্রী ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে সার্ভিস চালু না করলে তাদের লাইসেন্স বাতিলের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের নাব্যসংকটের অভিযোগ তোলেন। প্রয়োজনীয় ড্রেজিং না থাকায় আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার পরও সময়মতো বড় জাহাজ ও ফেরি চালানো সম্ভব হয়নি, যা জোয়ার আসা পর্যন্ত অর্থাৎ বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিলম্বিত হয়।
সমগ্র ঘটনায় সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজন হালদার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত স্বজনদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আমজাদ হোসেন গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, চিকিৎসা নিতে গিয়ে ঘাটে আটকে থেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এভাবে অকাল মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নৌরুটে শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক যাতায়াতব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনিকভাবে জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।









