বিশ্ব সংগীতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘৬৭তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস’ এবার কেবল সুরের মূর্ছনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের এক বিশাল মঞ্চ। যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অভিবাসন নীতি এবং বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গণ-তদন্ত ও বিতাড়ন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন বিশ্বসেরা সংগীতশিল্পী ও তারকারা। লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্রিপ্টো ডটকম অ্যারেনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিল্পীরা তাঁদের সংগীতের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সরব ভূমিকা পালন করেন।
ব্যাড বানি-র ঐতিহাসিক জয় ও কড়া বার্তা
এবারের গ্র্যামিতে ইতিহাস গড়েছেন পুয়ের্তো রিকান র্যাপার ব্যাড বানি। তাঁর আলোচিত অ্যালবাম ‘ডেবি তিয়ার মাস ফোতোস’-এর জন্য তিনি প্রথম স্প্যানিশ ভাষার শিল্পী হিসেবে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ জয় করেন। পুরস্কার গ্রহণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো রাখঢাক না করেই ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা পশু বা এলিয়েন নই; আমরা মানুষ এবং আমেরিকান। যারা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দেশ ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান, এই পুরস্কার তাঁদের সবার জন্য।” তিনি তাঁর বক্তব্যের শেষে ‘আইস আউট’ (ICE Out) স্লোগান দিয়ে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
শিল্পীদের সংহতি ও ‘আইস আউট’ মুভমেন্ট
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের রেড কার্পেট থেকে শুরু করে মূল মঞ্চ—সবখানেই ছিল প্রতিবাদের ছাপ। অনেক জনপ্রিয় তারকা তাঁদের পোশাকে ‘আইস আউট’ পিন পরে উপস্থিত হন। কিংবদন্তি জনি মিচেল থেকে শুরু করে জাস্টিন ও হেইলি বিবার দম্পতি, সবাই এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। কিউবান-আমেরিকান গায়িকা গ্লোরিয়া এস্তেফান অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “শত শত শিশু ডিটেনশন সেন্টারে আটকে আছে, এটি চরম অমানবিক। যারা দশকের পর দশক এই দেশে অবদান রেখেছে, তাঁদের এভাবে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।”
নিচে গ্র্যামি ২০২৬-এ অভিবাসন ইস্যুতে সোচ্চার হওয়া উল্লেখযোগ্য তারকাদের তালিকা দেওয়া হলো:
| তারকার নাম | সংশ্লিষ্টতা/মন্তব্য |
| ব্যাড বানি | অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার জয়ী; অভিবাসীদের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানান। |
| গ্লোরিয়া এস্তেফান | ডিটেনশন সেন্টারে শিশুদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। |
| অলিভিয়া ডিন | নিজেকে অভিবাসীর নাতনি হিসেবে পরিচয় দিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন। |
| শাবুজি | বলেন যে, অভিবাসীরাই আমেরিকাকে রঙিন ও সমৃদ্ধ করেছে। |
| বিলি আইলিশ | অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। |
| সিজা (SZA) | রাজপথে হওয়া সহিংসতার বিরুদ্ধে হতাশা প্রকাশ করেন। |
ট্রাম্পের কঠোর প্রতিক্রিয়া ও আইনি হুমকি
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ক্ষোভ উগরে দেন। বিশেষ করে সঞ্চালক ট্রেভর নোয়ার কড়া সমালোচনা করে তিনি এই অনুষ্ঠানকে ‘দেখার অযোগ্য’ এবং ‘বর্জ্য’ বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্প সরাসরি ট্রেভর নোয়া ও জিমি কিমেলের তুলনা করে বলেন যে, তাঁরা দুজনেই ব্যর্থ। এমনকি তিনি ট্রেভর নোয়ার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন। মূলত ট্রেভর নোয়া তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে ট্রাম্প ও নিকি মিনাজের রাজনৈতিক সখ্যতাকে ব্যঙ্গ করায় ট্রাম্প এমন মারমুখী অবস্থান নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এবারের গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস কেবল শিল্পীদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের আসর ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল বর্তমান মার্কিন রাজনীতির অস্থিরতা ও মানবাধিকার রক্ষার এক সাহসী প্রতিচ্ছবি।
