বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের ব্যক্তিজীবন কিংবা মাঠের আচরণ—সবখানেই এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা কাজ করে। গণমাধ্যমের ক্যামেরা বা সংবাদ সম্মেলনের জৌলুশ তাঁকে কখনোই টানেনি। যখনই তাঁকে ঘিরে কোনো বিতর্কের সৃষ্টি হয়, তিনি মৌনব্রত অবলম্বন করে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে উত্তর দিতে পছন্দ করেন। সম্প্রতি আইপিএল থেকে বাদ পড়া এবং বাংলাদেশের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার মতো বিশাল সব ঘটনা ঘটে গেলেও, মোস্তাফিজের প্রতিক্রিয়া কেবল তিন শব্দের এক বাক্যে সীমাবদ্ধ— ‘লেট ইট গো’।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ও মোস্তাফিজের অবস্থান
এবারের আইপিএলে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপির বিশাল অঙ্কে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে ভিড়িয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)-এর নির্দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি মোস্তাফিজের চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়। এই একটি ঘটনা বিশ্ব ক্রিকেটে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। নিরাপত্তার খাতিরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এমনকি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তান ম্যাচও বাতিলের খাতায় চলে যায়। এত কিছুর পরেও মোস্তাফিজের মাঝে কোনো আক্ষেপ বা হতাশার ছাপ লক্ষ্য করা যায়নি।
জাতীয় দলের সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দীন, যিনি বর্তমানে ‘অদম্য বাংলাদেশ টি-টুয়েন্টি’ টুর্নামেন্টে ধূমকেতু একাদশের প্রধান কোচের দায়িত্বে আছেন, তিনি মোস্তাফিজের মনের অবস্থা জানার চেষ্টা করেছিলেন। সালাউদ্দীনের প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজ অত্যন্ত শান্তভাবে বলেন, “লেট ইট গো”। অর্থাৎ, যা হারিয়ে গেছে বা যা হওয়ার ছিল, তা নিয়ে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না।
মোস্তাফিজের ক্যারিয়ার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
মোস্তাফিজের এই মানসিকতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা। নিচে মোস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| আইপিএল ২০২৬ দল | কলকাতা নাইট রাইডার্স (চুক্তি বাতিলকৃত) |
| চুক্তিমূল্য | ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি |
| বর্তমান দল | ধূমকেতু একাদশ (অদম্য বাংলাদেশ টি-টুয়েন্টি) |
| প্রধান প্রশিক্ষক | মোহাম্মদ সালাউদ্দীন |
| বিশ্বকাপ পরিস্থিতি | নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশ দলের ভারত সফর বাতিল |
| প্রতিক্রিয়া | “লেট ইট গো” (শান্ত ও নির্লিপ্ত) |
কোচ সালাউদ্দীনের মূল্যায়ন ও শিক্ষা
মোহাম্মদ সালাউদ্দীন মনে করেন, মোস্তাফিজের এই জীবনদর্শন অন্য ক্রিকেটারদের জন্যও শিক্ষণীয়। তিনি বলেন, “এত বড় অঙ্কের টাকা বা সুযোগ হাতছাড়া হলে যে কেউ হতাশায় নিমজ্জিত হতে পারত। কিন্তু মোস্তাফিজ জানে যে বিষয়টি তার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। যা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করা কেবল সময়ের অপচয়।” সালাউদ্দীন আরও যোগ করেন যে, যদিও সাধারণ মানুষের পক্ষে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, তবুও পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে বর্তমানের দিকে মনোনিবেশ করাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
বাংলাদেশ দল শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপ খেলতে চাইলেও আইসিসি তাতে সায় দেয়নি। দুই বছর ধরে অপেক্ষার পর এমন সুযোগ হাতছাড়া হওয়া ক্রিকেটারদের জন্য মানসিকভাবে অনেক বড় ধাক্কা। তবে সালাউদ্দীন আশাবাদী যে, মোস্তাফিজের মতো অন্য খেলোয়াড়রাও দ্রুত এই হতাশা কাটিয়ে উঠে ঘরোয়া ক্রিকেটে মনোযোগ দিতে পারবেন।
মোস্তাফিজুর রহমান আবারও প্রমাণ করলেন যে, তিনি কেবল বল হাতে ‘কাটার’ মাস্টার নন, বরং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এক অনন্য জাদুকর। মাঠের বাইরের কোলাহল তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না, তিনি কেবল বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে বিশ্বাসী।
