জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

গ্যাস বিহীন যেন আদিম যুগে ফিরে যাওয়া, কাঠ পুড়িয়ে ফ্যাক্টরি চালু রাখার সংগ্রাম নরসিংদীতে

দেশের অন্যতম বৃহৎ টেক্সটাইল হাব নরসিংদীতে তিতাস গ্যাসের চরম সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে শিল্প উৎপাদন। পাইপলাইনে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় জেলাটির শতাধিক ছোট-বড় কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। আর এই অচলাবস্থার মাঝেই অন্তত ৫০টি কারখানা আংশিক উৎপাদন সচল রাখতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে দেদারছে কাঠ পোড়াচ্ছে। তবে এতে একদিকে যেমন প্রতিদিনের উৎপাদন খরচ হু হু করে বাড়ছে, অন্যদিকে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পরিবেশগত ঝুঁকি।

নরসিংদীর চৌয়ালা শিল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায় কারখানার বয়লারগুলোতে কাঠ পোড়ানোর এই করুণ চিত্র। সুতা প্রক্রিয়াজাতকারী সাইজিং কারখানাগুলোকে তাদের স্টিম বয়লার চালু রাখতে এখন নিয়মিত কাঠের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। হক টেক্সটাইল ও ইউনিফিল টেক্সটাইল মিলের মতো কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের একের পর এক কাঠের গুঁড়ি বয়লারে ঢালতে দেখা যায়। কারখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে গ্যাসের চাপ কম থাকলে কিংবা বয়লারের প্রাথমিক উত্তাপের জন্য ঝুট কাপড় ব্যবহার করা হতো। কিন্তু সম্প্রতি বাজারে ঝুট কাপড়ের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় এখন বাধ্য হয়ে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কাঠ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে প্রতিটি কারখানায় কেবল বয়লারের জন্য কাঠের পেছনেই দিনে ১০ হাজার টাকার বেশি বাড়তি খরচ গলে যাচ্ছে।

দৈনিক ক্ষতি ৩০০ কোটি টাকা, কারখানাভেদে উৎপাদন কমেছে ৭০%

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের তথ্যমতে, নরসিংদীতে সব মিলিয়ে চার হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় তিন হাজারই টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও তৈরি পোশাক শিল্প খাতের। এসব কারখানার মধ্যে প্রায় ৪০০টি পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর। স্বাভাবিক ও নিখুঁত উৎপাদনের জন্য এসব কারখানায় নিয়মিত ১০ থেকে ১৫ পিএসআই (PSI) চাপে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের প্রয়োজন হয়।

আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নরসিংদীতে গ্যাসের সরবরাহে টান পড়েছিল। কিন্তু গত কিছুদিনে সেই পরিস্থিতি চরম রূপ নেয়। চৌয়ালা টেক্সটাইল শিল্প মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, এই তীব্র গ্যাস সংকটে জেলার শিল্প খাতে দিনে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হচ্ছে। যেসব কারখানা কাঠের মতো বিকল্প ব্যবস্থা কিংবা স্বল্প চাপের গ্যাসে কোনোরকমে চালু রাখা হয়েছে, সেগুলোতে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। এমনকি অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ ক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশ নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে।

সাইজিং ও ডাইং কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাবে তৈরি পোশাকের পুরো সাপ্লাই চেইনে ধস নেমেছে। অল মদিনা টেক্সটাইল মিলের স্বত্বাধিকারী মো. ইরতাজুল ইসলাম জানান, সাইজিং মিলগুলো থেকে প্রক্রিয়াজাত সুতা না পাওয়ায় তারা গ্রে কাপড় তৈরি করতে পারছেন না। আগে তাদের কারখানায় দৈনিক ১ লাখ গজ কাপড় তৈরি হলেও এখন তা নেমে এসেছে ৩০ হাজার গজের নিচে। ফলে লোকসান কমাতে ১৫০ জন শ্রমিকের মধ্যে ১০০ জনকেই বাধ্য হয়ে ছুটিতে পাঠাতে হয়েছে।

রপ্তানিমুখী বড় শিল্পেও বড় ধরনের বিপর্যয়

গ্যাস সংকটের চরম প্রভাবে পড়েছে জেলার সবচেয়ে পুরোনো ও বড় কারখানা মোমিন টেক্সটাইল মিলেও। শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে ডাইং ও ফিনিশিং করা কাপড় রপ্তানি করা এই মিলের ১০টি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে সাতটিই এখন পুরোপুরি বন্ধ।

প্রতিদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে ২২ হাজার থেকে ২৩ হাজার ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও কারখানাটি বর্তমানে পাচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ১০ হাজার ঘনফুট। ফলে তাদের ২৫ লাখ গজ কাপড় উৎপাদনের দৈনিক সক্ষমতা ভেঙে পড়ে মাত্র ২০ হাজার গজে নেমে এসেছে। কারখানাটির আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনই বর্তমানে অলস সময় কাটাচ্ছেন, যদিও মালিকপক্ষ থেকে তাদের বেতন দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হাতে বর্তমানে অন্তত ২০ লাখ গজ কাপড়ের রপ্তানি আদেশ রয়েছে, যা যথাসময়ে সরবরাহ করা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। এখন বিকল্প হিসেবে তিতাসের পাইপলাইন গ্যাসের বদলে এলপিজি ব্যবহারের কথা ভাবা হলেও এতে প্রতি গজ কাপড়ে অন্তত আড়াই টাকা উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন করে তুলবে।

চাহিদার অর্ধেকের নিচে নামল তিতাসের গ্যাস সরবরাহ

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের নরসিংদী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলাজুড়ে আবাসিক, বাণিজ্যিক, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা কমপ্লেক্স এবং বিভিন্ন শিল্প খাতের মাসে মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৩ কোটি ঘনমিটার। কিন্তু বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস স্বল্পতার কারণে সরবরাহ নেমে এসেছে চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে।

নরসিংদী তিতাস কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. মাকসুদুর রহমান কারখানাগুলোর চরম দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে জানান, সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকায় কারখানাগুলোতে চাহিদামতো চাপে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে খুব দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আন্তর্জাতিক বাজার ও ক্রেতা হারানোর চরম ঝুঁকিতে পড়বে দেশের অন্যতম এই টেক্সটাইল হাব।

নরসিংদীর গ্যাস সংকট ও শিল্প খাতের সার্বিক পরিসংখ্যান

ক্রমিকবিবরণ / সূচকপরিসংখ্যান ও তথ্য
জেলার মোট শিল্পকারখানার সংখ্যা৪,০০০-এর বেশি
বস্ত্র ও পোশাক খাতের কারখানাপ্রায় ৩,০০০টি (টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ইত্যাদি)
পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর কারখানার সংখ্যাপ্রায় ৪০০টি
স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ১০ থেকে ১৫ পিএসআই (PSI)
গ্যাস সংকটে পুরোপুরি বন্ধ কারখানার সংখ্যা১০০-এর বেশি
বিকল্প জ্বালানি (কাঠ) ব্যবহারকারী কারখানাঅন্তত ৫০টি
শিল্প খাতে দৈনিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণপ্রায় ৩০০ কোটি টাকা
চালু থাকা কারখানাগুলোতে উৎপাদন হ্রাসের হারগড়ে ৭০% পর্যন্ত (কিছু কারখানা চলছে ১০% সক্ষমতায়)
বয়লারে প্রতিদিন কাঠের পেছনে অতিরিক্ত খরচপ্রতি কারখানায় ১০,০০০ টাকার বেশি
১০মোমিন টেক্সটাইলের মোট ইউনিট ও বন্ধ ইউনিট১০টি ইউনিটের মধ্যে ৭টিই বন্ধ
১১মোমিন টেক্সটাইলে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ও প্রাপ্তিচাহিদা ২২,০০০—২৩,০০০ ঘনফুট; প্রাপ্তি মাত্র ৮,০০০—১০,০০০ ঘনফুট
১২মোমিন টেক্সটাইলের দৈনিক সক্ষমতা ও বর্তমান উৎপাদনসক্ষমতা ২৫ লাখ গজ; বর্তমান উৎপাদন মাত্র ২০,০০০ গজ
১৩মোমিন টেক্সটাইলে কর্মহীন শ্রমিকের সংখ্যা২,৫০০ জন শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১,৫০০ জন
১৪অল মদিনা টেক্সটাইলের উৎপাদন হ্রাস ও শ্রমিক ছুটিউৎপাদন ১ লাখ গজ থেকে ৩০ হাজারে নেমেছে; ১৫০ শ্রমিকের মধ্যে ১০০ জন ছুটিতে
১৫নরসিংদী জেলায় গ্যাসের মোট মাসিক চাহিদাপ্রায় ১৩ কোটি ঘনমিটার (আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প মিলিয়ে)
Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর