ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানের পূর্বনির্ধারিত নিরাপদ নৌরুট অনুসরণ করতে হবে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, যার কারণে এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, যা এপ্রিল মাসের বাইশ তারিখ পর্যন্ত চলবে বলে জানানো হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের বন্দরের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ বহাল থাকবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন হলেও নীতিগত অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও সেখানে এখনো খুব সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ এখনো এই পথ ব্যবহার থেকে বিরত রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, শুধুমাত্র নির্ধারিত নৌপথ অনুসরণ করেই জাহাজ চলাচল অনুমোদিত হবে। পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নীতিমালা ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রস্তাবিত মানচিত্র এবং নির্ধারিত দুইটি নৌরুটের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণাকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানায়। কিছু সংবাদমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকলে এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে কয়েকটি গণমাধ্যম সরকারের কাছ থেকে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দাবিকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং নৌপথ ব্যবস্থাপনা ইরানের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিবৃতিতে জানান, জাহাজ চলাচল অবশ্যই পূর্বনির্ধারিত নিরাপদ রুট অনুসরণ করে পরিচালিত হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ অব্যাহত থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
নিচে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বর্তমান শর্তসমূহ উপস্থাপন করা হলো—
| বিষয় | বর্তমান শর্ত |
|---|---|
| বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল | নির্ধারিত নিরাপদ নৌরুট অনুসরণ বাধ্যতামূলক |
| যুদ্ধজাহাজ প্রবেশ | সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ |
| নৌপথ ব্যবহারের অনুমতি | ইরানের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল |
| নিরাপত্তা পরিস্থিতি | যাচাই সাপেক্ষে সীমিত চলাচল |
| অবরোধ পরিস্থিতি | বহাল থাকলে প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা সম্ভাব্য |
বিশ্লেষণধর্মী সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও সামুদ্রিক চলাচল এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসেনি। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত পর্যায়ে রয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণাধীন রয়েছে।
