দেশে হামের উপসর্গে আরও ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তথ্য পেতে দেরি হওয়ায় ২১ সেপ্টেম্বরের চারটি মৃত্যুও সর্বশেষ হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে ১৫ মার্চ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৬ জন। এর মধ্যে ৯৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ১০১ জনের মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত, হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১৫৭ জন শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১১৩ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গের মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৪৯। নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ৮৫১।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬১২ জন। অর্থাৎ আক্রান্তের বড় একটি অংশ চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও বিপুলসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে ভর্তির কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে ঢাকায় পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ঢাকা বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৮২ জন শনাক্ত হয়েছেন এবং এ সময়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার জেলাতেই মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন করে ২৩৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন দুজন। খুলনা, রংপুর ও সিলেটেও একজন করে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
চলতি মাসের মৃত্যুর হিসাবও পরিস্থিতির তীব্রতা স্পষ্ট করছে। সেপ্টেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত হামে ৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব জানানো হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। দেশে বছরের শুরু থেকেই সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও মার্চের মাঝামাঝি থেকে এর বিস্তার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এপ্রিলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণেও দেখা গিয়েছিল, দেশের আটটি বিভাগের ৫৮টি জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই মোট শনাক্ত রোগীর বড় অংশ ছিল এবং দুই বছরের কম বয়সী, বিশেষ করে টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
হামের সংক্রমণ অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারেন। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি নিউমোনিয়া, অপুষ্টি ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা এবং টিকাদানের উচ্চ হার বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি বছরের শুরুতে সংক্রমণ বাড়ার পর সরকার জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয়। এপ্রিলের শুরুতে উচ্চঝুঁকির ৩০টি উপজেলায় কর্মসূচি শুরু হয় এবং পরে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারিত করা হয়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বড় অংশকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল।
জাতিসংঘের স্বাস্থ্য ও শিশু বিষয়ক সংস্থাগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে টিকাদানের কাভারেজে তৈরি হওয়া ঘাটতি বড় আকারের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় ডোজের টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়ায় অনেক শিশু হাম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা থেকে বাইরে থেকে গেছে। সংস্থাগুলোর মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে দুই ডোজ টিকার কাভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশে রাখা জরুরি।
এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পর দেশজুড়ে টিকাদানও ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। জুনের শেষ নাগাদ ১ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনার তথ্য পাওয়া যায়, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।
তবে টিকাদানের পরও নতুন রোগী ও মৃত্যুর খবর পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সর্বশেষ পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতাই সামনে আনছে। বিশেষ করে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যুর তুলনায় অনেক বেশি। এর অর্থ, বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি; তাই উপসর্গভিত্তিক হিসাব এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হিসাবকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
এদিকে চলমান সংক্রমণের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব সন্দেহভাজন রোগীর ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হয় না। ফলে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা পুরো সংক্রমণের চিত্র তুলে ধরে না; উপসর্গভিত্তিক রোগীর সংখ্যা এই বৃহত্তর পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ১১ মৃত্যুর তথ্য এবং ১ হাজারের বেশি নতুন উপসর্গযুক্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে, দেশে হাম এখনো বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। শিশুদের টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করাই সংক্রমণের বিস্তার কমানোর প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।








