গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্য হত্যার ঘটনায় তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় গৃহকর্তা ফোরকান মিয়াকে প্রধান আসামি করে কাপাসিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আরও তিন থেকে চারজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘটনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে অনুসন্ধান চলছে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
গত শনিবার সকালে কাপাসিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামের একটি ভাড়া বাসা থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন শারমিন আক্তার (৩০), তাঁর তিন মেয়ে মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), মোসা. ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ভাই রসুল মিয়া (২২)। শারমিনের বাবার বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামে। অভিযুক্ত ফোরকানের বাড়িও একই উপজেলার মেরি গোপীনাথপুর গ্রামে। পরিবার নিয়ে তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে কাপাসিয়ায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। তিনি পেশায় প্রাইভেট কারচালক ছিলেন। নিহত রসুল মিয়া গাজীপুর সদরের একটি কারখানায় কাজ করতেন।
নিহতদের পরিচয়
| নাম | বয়স | পরিচয় |
|---|---|---|
| শারমিন আক্তার | ৩০ | স্ত্রী |
| মীম খানম | ১৫ | মেয়ে |
| উম্মে হাবিবা | ৮ | মেয়ে |
| মোসা. ফারিয়া | ২ | মেয়ে |
| রসুল মিয়া | ২২ | শ্যালক |
ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে নিহত শারমিন আক্তারের পরনের পোশাক ও অলংকার। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর গলায় হার, হাতে চুড়ি এবং পরনে নতুন শাড়ি ছিল। এ বিষয়টিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোসা. শ্রাবণী বলেন, ঘটনাটি পরিকল্পিত কি না এবং হত্যার আগে বা পরে শারমিনকে সাজানো হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মিয়া বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে শারমিনকে পরিপাটি অবস্থায় দেখা গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অলংকারগুলো আগে থেকেই পরা ছিল, নাকি পরে পরানো হয়েছে, সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে। একই সঙ্গে ওই রাতে ঘটনাস্থলে অন্য কেউ উপস্থিত ছিল কি না, তা–ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।
নিহতদের ভাই আরোজ আলী জানান, স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, ঘটনার দিন বিকেলে ফোরকান স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সে সময় শারমিন নতুন শাড়ি ও সিটি গোল্ডের গয়না পরেছিলেন। তাঁর দাবি, হত্যার সময়ও শারমিনের গায়ে একই পোশাক ছিল।
শারমিনের বাবা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, পুলিশ তাঁদের ঘটনাস্থলে ঘরে ঢুকতে দেয়নি। ফলে মেয়ের গায়ে কী ছিল, তা তিনি নিজে দেখেননি। তবে স্থানীয়দের কাছ থেকে নতুন কাপড় ও অলংকারের কথা শুনেছেন। তাঁর ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।
গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক মাজহারুল হক জানান, নিহতদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। রসুল মিয়ার গলায় গভীর কাটা দাগ ছিল। আট বছর বয়সী শিশুর গলায় দুটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বড় মেয়ে মীমের গলা, মুখ ও হাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। চিকিৎসকদের ধারণা, তিনি হয়তো প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। দুই বছরের শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ফরেনসিক বিভাগ জানিয়েছে, নিহতদের পাকস্থলির নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তাঁদের নেশাজাতীয় কিছু খাওয়ানো হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষার প্রতিবেদনের পর জানা যাবে। একই সঙ্গে প্রাথমিকভাবে শারমিন আক্তারের ওপর যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক।
ঘটনার পর ফোরকান মিয়া তাঁর ভাই মিশকাতকে ফোন করে সবাইকে হত্যা করার কথা বলেছিলেন বলে দাবি করেছেন শারমিনের ফুফু ইভা আক্তার। পরে স্বজনেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহগুলো দেখতে পান এবং ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।
স্বজনদের দাবি, ফোরকান দ্বিতীয় বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, যা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। কয়েক মাস আগে শারমিনকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনাস্থল থেকে ফোরকান মিয়ার নামে টাইপ করা একটি অভিযোগপত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। সেখানে স্ত্রী, শ্বশুরসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়া ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়। তবে গোপালগঞ্জ সদর থানার পুলিশ জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি তাদের থানায় জমা হয়নি। নিহত শারমিনের স্বজনদের দাবি, নিজেকে রক্ষার জন্যই এমন অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।









