রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকার একটি আবাসিক ভবনের নিচতলার কক্ষে বিস্ফোরণের পর আগুন লেগে তিন ফার্নিচারকর্মী দগ্ধ হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনজনেরই শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দগ্ধের চিহ্ন রয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
দগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন মো. জুয়েল (২০), তাঁর চাচাতো ভাই মো. পারভেজ (২১) এবং রানা মিয়া। তাঁদের সবার বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলায়। জীবিকার প্রয়োজনে তাঁরা ঢাকায় এসে কাঁঠালবাগানের একটি ফার্নিচারের দোকানে কাজ করতেন।
ঘটনাটি ঘটে বুধবার রাত প্রায় পৌনে ১২টার দিকে কাঁঠালবাগানের ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকার একটি সাততলা ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে। ওই কক্ষেই জুয়েল তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাড়া থাকতেন। তবে কয়েক দিন আগে তাঁর বাবা-মা গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় সেদিন রাতে কাজ শেষে জুয়েল তাঁর দুই সহকর্মী ও স্বজন পারভেজ এবং রানাকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়লে তিনজনই দগ্ধ হন।
আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ফার্নিচারের দোকানের মালিক রাজি মিয়া জানান, কক্ষটি একটি সেফটি ট্যাংকের ওপর নির্মিত। স্থানীয়ভাবে সেখানে মাঝেমধ্যে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যেত। তাঁর ধারণা, দীর্ঘ সময় কক্ষটি বন্ধ থাকায় ভেতরে দাহ্য গ্যাস জমে ছিল। মশার কয়েল জ্বালানোর জন্য ম্যাচ জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই গ্যাসে আগুন ধরে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে কক্ষের এক পাশের দেয়াল ভেঙে পড়ে এবং নিচের সেফটি ট্যাংকের ঢাকনাও খুলে যায়। এতে ভবনের নিচতলার অংশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফজলে আশিক জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কক্ষটি প্রায় দুই দিন বন্ধ ছিল। রাতে তিন যুবক সেখানে প্রবেশ করার পর লাইটার জ্বালাতেই হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সঙ্গে সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁদের ধারণা, কক্ষের নিচে থাকা সেফটি ট্যাংক থেকে নির্গত গ্যাস দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকতে পারে। একই সঙ্গে ওই কক্ষে গ্যাসের পাইপলাইনের সংযোগও ছিল। ফলে বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী রানা মিয়ার শরীরের প্রায় ৬৩ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মো. জুয়েলের শরীরের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং মো. পারভেজের শরীরের প্রায় ২১ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাঁদের অবস্থাও গুরুতর এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই সতর্ক করে থাকেন, আবদ্ধ কক্ষ বা সেপটিক ও সেফটি ট্যাংকের আশপাশে দাহ্য গ্যাস জমে থাকলে আগুনের উৎস তৈরি হলেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ধরনের স্থাপনায় যথাযথ বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং আগুন জ্বালানোর আগে সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। কাঁঠালবাগানের এই দুর্ঘটনাও নগর ভবনগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য গ্যাস ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।









