জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

এলএনজি কার্গো সংকটে ফের গ্যাস সরবরাহে ধস

এলএনজি আমদানির নির্ধারিত কার্গো সময়মতো দেশে আনতে না পারা এবং একটি কার্গো ফেরত পাঠানোর ঘটনায় দেশে নতুন করে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের পরিকল্পনা, তদারকি ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির কারণেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে আবাসিক রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার বয়লার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও।

পেট্রোবাংলার আওতাধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি, খালাস এবং ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালগুলোর তদারকির দায়িত্বে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে এই ব্যবস্থাপনায় একাধিক সিদ্ধান্ত ও সমন্বয় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে একটি কার্গো ফেরত পাঠাতে হয়েছে। পরে ১৭ আগস্ট নির্ধারিত আরেকটি কার্গোও দেশে আনা সম্ভব হয়নি। এতে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯ আগস্ট থেকে। একটি ভাসমান টার্মিনাল এলএনজি সরবরাহের অভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হয়। পরবর্তী কার্গো ২৩ আগস্টের দিকে দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তার আগে পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতির সুযোগ সীমিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্যাস খাতের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সংকট এড়াতে আগাম পরিকল্পনা ও যথাযথ সমন্বয় করা গেলে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা ছিল না। বিশেষ করে এলএনজি কার্গো সংগ্রহ ও টার্মিনালে খালাসের প্রক্রিয়ায় দায়িত্বশীলদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ ঘটনাগুলোতে ইচ্ছাকৃত নাশকতা বা অন্য কোনো অনিয়মের আশঙ্কা থাকলে তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। গত ২১ জুলাই একটি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার ভূমিকা যথেষ্ট দৃশ্যমান ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে যথাসময়ে সঠিক তথ্য জানানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ওই কর্মকর্তার অভিযোগ, সৌদি আরবের আরামকো থেকে এমন একটি এলএনজি কার্গো আনা হয়েছিল, যেটিকে তিনি পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। কার্গোটি খালাসে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি অস্বীকৃতি জানালে শেষ পর্যন্ত তা ফেরত পাঠাতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, কার্গোটির বিষয়ে ঝুঁকি জানা থাকা সত্ত্বেও কেন তা আমদানি করা হয়েছিল, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এরপর এলএনজি আমদানির জন্য নিয়মিত ঠিকাদারের পরিবর্তে পছন্দের একটি ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। শেষ পর্যন্ত ওই ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে এলএনজি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলামের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরে তাঁর পক্ষ থেকে ফোন করে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির পেছনে শুধু সাম্প্রতিক এলএনজি সংকটই নয়, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়াও বড় কারণ। একসময় দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো। বর্তমানে সেই উৎপাদন কমে প্রায় ১৬২৬ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনও ধীরে ধীরে কমছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম প্রধান গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়া। একসময় এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। ২০ আগস্ট সেই উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৭৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। বর্তমানে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বিবিয়ানা থেকে প্রায় ৪৫ শতাংশের বেশি গ্যাস আসে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের মোট কনডেনসেট সরবরাহের বড় অংশও এই গ্যাসক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল।

গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডে একটি ভাসমান টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে প্রায় ২১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। এতে সারাদেশে তীব্র সংকট দেখা দেয়। ৬ আগস্ট ওই টার্মিনাল থেকে আংশিক সরবরাহ শুরু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু ১৩ আগস্ট থেকে এলএনজি সরবরাহের ঘাটতির কারণে সংকট আবার বাড়তে থাকে। সর্বশেষ ১৯ আগস্ট এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

গ্যাসের এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের ওপর। আবাসিক এলাকায় অনেক সময় চুলায় পর্যাপ্ত চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পের বয়লার পরিচালনাতেও চাপ বাড়ছে। ফলে এলএনজির পরবর্তী কার্গো সময়মতো দেশে পৌঁছানো এখন গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সংকটের কারণগুলো খতিয়ে দেখে এলএনজি আমদানি, কার্গো নির্বাচন, ঠিকাদার নিয়োগ, টার্মিনাল পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতা কোথায় ছিল, তা নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ক্রমাগত কমতে থাকায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই অবস্থায় একটি কার্গো ব্যর্থ হওয়া বা একটি টার্মিনাল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর