এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রিতে কমিশন বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং প্রশাসনিক হয়রানি ও অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধসহ সাত দফা দাবিতে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি বিক্রির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দাবি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পরবর্তী সময়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য দোকান বন্ধ রাখারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের এ কর্মসূচিতে গৃহস্থালি রান্না, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং এলপিজিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ নেই, এমন এলাকার পরিবারগুলো সিলিন্ডার সংগ্রহে ভোগান্তিতে পড়তে পারে। এরই মধ্যে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। ফলে দুই দিনের ধর্মঘট কার্যকর হলে বাজারে বিদ্যমান চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির ঘোষণা দেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. সেলিম খান। তিনি জানান, সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টানা দুই দিন দেশের সব এলপিজি বিক্রির দোকান বন্ধ থাকবে। এর মধ্যে দাবিগুলোর বিষয়ে কার্যকর সমাধান না এলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০–৭০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ
এলপিজির দাম ও সরবরাহ নিয়ে বিরোধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে একই সিলিন্ডার কিনতে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে।
সে হিসাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে ভোক্তাদের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৩৩৭ থেকে ২ হাজার ৫৩৭ টাকা। রান্নার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত এই জ্বালানির জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসকেরাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির তথ্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বাজার তদারকির কার্যকারিতা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) দাবি করেছে, দেশে এলপিজির আমদানি ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
অন্যদিকে পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান কমিশনে তাঁদের পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার দাবি এবং মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়ীদের ব্যয়ের চাপ—দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাজারে প্রকৃতপক্ষে কোথায় সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে, কোথায় পরিবহন বা বিতরণব্যবস্থায় সমস্যা হচ্ছে এবং কোন পর্যায়ে দাম বাড়ছে, তা নির্ধারণে সমন্বিত তথ্য প্রয়োজন।
সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ৫০ থেকে ১৫০ টাকা করার দাবি
ব্যবসায়ীদের প্রধান দাবি, প্রতি সিলিন্ডারে পরিবেশক কমিশন বর্তমান ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে।
সমিতির সভাপতি সেলিম খানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বছর আগে বিইআরসি পরিবেশকদের জন্য প্রতি সিলিন্ডারে ৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। এরপর জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানোর খরচ, গুদামভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও লাইসেন্স ফি বেড়েছে। একই সঙ্গে কর্মচারীদের বেতনসহ ব্যবসা পরিচালনার অন্যান্য ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা সিলিন্ডারের কারণেও আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।
এর আগে গত ৮ অক্টোবর কমিশন বৃদ্ধির দাবিতে বিইআরসির কাছে লিখিত আবেদন করে সংগঠনটি। সেখানে সিলিন্ডারপ্রতি পরিচালন ব্যয়ের একটি হিসাব তুলে ধরা হয়।
ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানির কাছ থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত একটি সিলিন্ডার আনতে প্রায় ৫০ টাকা ব্যয় হয়। সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে লাগে আরও ৩৫ টাকা। কর্মচারীদের বেতন, গুদামভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচ বাবদ ব্যয় হয় ২৫ টাকা। এসব ব্যয়ের সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা যোগ করে তাঁরা প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন কমিশন অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে কমিশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভোক্তাদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কমিশন কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়বে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে স্বচ্ছ আলোচনা জরুরি।
মাসে একাধিকবার দাম পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি
এলপিজির মূল্য সমন্বয়ের পদ্ধতি নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, বিইআরসি প্রতি মাসে একবার দাম নির্ধারণ করলেও কিছু কোম্পানি পাঁচ থেকে সাত দিন পর নিজেদের সিদ্ধান্তে আবার দাম পরিবর্তন করে। এতে পরিবেশকদের পণ্য কেনার খরচ ও বিক্রির দামের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।
কোনো কোম্পানি এক মাসে একাধিকবার দাম সমন্বয় করতে চাইলে তা বিইআরসির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে সমিতি। তাদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মূল্যকাঠামোর বাইরে বারবার দাম পরিবর্তন হলে পরিবেশকদের হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ে।
কোম্পানির সরবরাহ চালানে সিলিন্ডারের প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করারও দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে পরিবেশকেরা কী দামে পণ্য কিনছেন, তা স্পষ্ট থাকবে এবং ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের হিসাব যাচাই করা সহজ হবে।
পাশাপাশি যেসব কোম্পানি পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত সিলিন্ডার পৌঁছে দেয় না, তাদের কাছ থেকে ন্যায্য পরিবহনভাড়া নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, সরবরাহের দায়িত্ব ও পরিবহন ব্যয় নির্দিষ্ট না থাকায় পরিবেশকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
সরবরাহসংকট ও এলসি খোলার জটিলতা
সংবাদ সম্মেলনে এলপিজি সরবরাহের ঘাটতি এবং আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতারা।
সেলিম খানের দাবি, বর্তমানে ছয় থেকে সাতটি কোম্পানি ছাড়া অধিকাংশ কোম্পানি পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান এলসি খুলতে না পারায় আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সমিতির দাবি, সারা দেশে কয়েক লাখ খালি সিলিন্ডার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এসব সিলিন্ডারে পুনরায় গ্যাস ভরে বাজারে সরবরাহ করা গেলে বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহে অক্ষম কোম্পানিগুলোর সিলিন্ডারে সরকারি উদ্যোগে অথবা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে পুনরায় গ্যাস ভরার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের যুক্তি, ব্যবহারযোগ্য সিলিন্ডার পড়ে থাকলে একদিকে সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা কাজে লাগানো যায় না, অন্যদিকে বাজারে চাহিদা পূরণেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াবের বক্তব্যের সঙ্গে এ দাবির পার্থক্য রয়েছে। লোয়াব যেখানে দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহের কথা বলছে, সেখানে ব্যবসায়ীরা সরবরাহের ঘাটতি ও এলসি-সংক্রান্ত জটিলতার অভিযোগ তুলছেন। এ পরিস্থিতিতে আমদানি, কোম্পানির মজুত, পরিবেশকদের কাছে সরবরাহ এবং খুচরা বাজারে বিক্রির পরিমাণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।









