,

ওড়িশায় বাঙালি জনবসতি ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ইতিবৃত্ত

পূর্ব ভারতের ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাচীন গৌড়-বঙ্গ এবং কলিঙ্গ-উৎকলের সীমানা কখনোই কেবল কোনো রাজনৈতিক বাধা বা কৃত্রিম কৃত্রিমতার ফ্রেমে আবদ্ধ ছিল না। সুবর্ণরেখা ও মেদিনীপুর অববাহিকার উর্বর প্লাবনভূমি জুড়ে বিস্তৃত এই দুই অঞ্চলের সংযোগ সুপ্রাচীন। প্রাচীন তাম্রলিপ্ত বন্দরের সামুদ্রিক বাণিজ্য রুট, কলিঙ্গ উপকূলের বন্দর এবং উৎকলের পুণ্যভূমি হাজার বছর ধরে দুই ভূখণ্ডের কৃষক, বণিক, ধর্মপ্রচারক ও শিল্পীদের এক অবিচ্ছেদ্য সামাজিক বন্ধনে যুক্ত রেখেছিল। ধৌলি থেকে জলেশ্বর এবং বালেশ্বর থেকে ময়ূরভঞ্জ পর্যন্ত যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর, তা মূলত বঙ্গীয় ও উৎকলীয় সভ্যতার এক গভীর ও আত্মিক সহাবস্থানের অম্লান দলিল।

ওড়িশার মাটিতে বঙ্গীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে কালজয়ী ও সংবেদনশীল ভিতটি তৈরি হয়েছিল ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পুরী বা ‘শ্রীক্ষেত্র’ গমনের মাধ্যমে। ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীচৈতন্য যখন নীলাচল ধামে পদার্পণ করেন এবং জীবনের শেষ চব্বিশ বছর সেখানে অতিবাহিত করেন, তখন থেকেই গৌড় ও উৎকলের মধ্যে এক অভূতপূর্ব অধ্যাত্ম-সিলসিলা গড়ে ওঠে। তৎকালীন গজপতি রাজা প্রতাপরুদ্র দেবের অনুরাগী সামাজিক অবস্থান এবং শ্রী চৈতন্যের প্রেমধর্মের সান্নিধ্যে উৎকলের প্রখ্যাত ‘পঞ্চসখা’ (বলরাম দাস, অতিবড়ী জগন্নাথ দাস, অচ্যুतानন্দ দাস প্রমুখ) এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব পণ্ডিতদের মধ্যে এক গভীর নন্দনতাত্ত্বিক ও সামাজিক আদান-প্রদান ঘটে। পুরী কেবল ধাম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা রূপ নিয়েছিল বঙ্গ ও উৎকলের যৌথ প্রজ্ঞাপীঠে। এই বৈষ্ণব ভাবান্দোলন বাংলা ও ওড়িয়া উভয় ভাষার পদাবলী সাহিত্য, কীর্তন, শিল্পকলা ও মননশীলতায় এমন এক চিরন্তন বন্ধন তৈরি করেছিল, যা আজও দুই ভূখণ্ডের মানুষকে এক সূত্রে গেঁথে রেখেছে।

১৮০৩ সালে মারাঠাদের পরাজিত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওড়িশা দখল করার পর ব্রিটিশ প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ওড়িশায় আধুনিক বাঙালি মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক সমাজের স্থায়ী অভিবাসনের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। তৎকালীন অখণ্ড বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ হিসেবে ওড়িশা শাসিত হতে থাকায় কটক, বালেশ্বর ও পুরীতে নতুন রাজস্ব ব্যবস্থা, বিচারালয় এবং প্রশাসনিক দপ্তরসমূহ গড়ে ওঠে। এই ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা করতে বিপুলসংখ্যক বাঙালি আইনজীবী, ম্যাজিস্ট্রেট, রাজস্ব কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং চিকিৎসক কটকে এসে বসতি স্থাপন করেন। বিশেষ করে তৎকালীন ওড়িশার প্রশাসনিক কেন্দ্র কটক শহরটি খুব দ্রুত বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের প্রধান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ওড়িশার শিক্ষাব্যবস্থা ও সাহিত্যিক নবজাগরণে বাঙালিদের অবদান ছিল অত্যন্ত গভীর ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। ১৮৬০-এর দশকে কান্তিলাল ভট্টাচার্য নামে এক বাঙালি শিক্ষকের “উড়িয়া একটি স্বতন্ত্র ভাষা নহে” শীর্ষক বিতর্কিত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ওড়িয়া ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার যে ঐতিহাসিক সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তাতে বাংলাভাষী ও ওড়িয়াভাষী উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীরা যৌথভাবে ওড়িয়া ভাষার মর্যাদা পুনপ্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছিলেন। কটকের বিখ্যাত উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরবর্তীতে আধুনিক ওড়িয়া সাহিত্যের অন্যতম প্রধান মহাকবি রাধানাথ রায় (যিনি মূলতঃ বাংলাভাষী পরিবারের সন্তান হয়েও ওড়িয়া ভাষায় কালজয়ী মহাকাব্য রচনা করেন), গৌরীশঙ্কর রায় এবং ‘ব্যাসকবি’ ফকীর মোহন সেনাপতির ত্রিমুখী প্রচেষ্টা ওড়িয়া ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় করে। পাশাপাশি কটকের ঐতিহাসিক ‘র‍্যাভেন্সা কলেজ’ (Ravenshaw College) এবং বিভিন্ন জেলা স্কুলে বাঙালি অধ্যাপক ও শিক্ষকদের নিষ্ঠাপূর্ণ ভূমিকা উৎকলের আধুনিক শিক্ষাবিস্তারে অবিনশ্বর অবদান রেখেছিল।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৫০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার বাঙালি হিন্দু শরণার্থীদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া ওড়িশার জনমিতি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব রূপান্তর নিয়ে আসে। ভারত সরকার পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘দণ্ডকারণ্য প্রকল্প’-এর আওতায় দক্ষিণ ওড়িশার কোরাপুট, মালকানগিরি, রায়গড়া এবং নবরঙ্গপুর জেলার গভীর অরণ্য ও পাহাড়ি উপত্যকায় বিপুলসংখ্যক বাঙালি কৃষক ও শ্রমজীবী পরিবারকে বসতি স্থাপন করতে দেওয়া হয়। চরম প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ও ম্যালেরিয়া-প্রবণ জঙ্গল পরিষ্কার করে নিজেদের রক্ত জল করা পরিশ্রমে এই বাস্তুচ্যুত বাঙালিরা মালকানগিরি ও কোরাপুটের পাথুরে ভূমিকে সোনা-ফলানো উর্বর কৃষিক্ষেত্রে পরিণত করেন। ধান, সবজি ও মৎস্যচাষে তাঁদের অভূতপূর্ব সাফল্য সমগ্র দক্ষিণ ওড়িশার গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনে এক স্থায়ী বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়।

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ওড়িশার বাঙালি সমাজ উৎকলীয় সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে একীভূত ও আত্মীকৃত। বালেশ্বরের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে কটক, ভুবনেশ্বর, পুরী এবং রাউরকেল্লার শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত বাঙালিরা ওড়িশার সামাজিক ও নাগরিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কটকের চৌধুরী বাজার ও কাজীবাজারের শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা, ভুবনেশ্বরের রবীন্দ্র জয়ন্তী, পুরীর শ্রীক্ষেত্র সংলগ্ন প্রাচীন বাঙালি বাড়িগুলোর নিত্যদিনের সংস্কৃতি—সবকিছুতেই বঙ্গীয় ঐতিহ্যের উজ্জ্বল উপস্থিতি বিদ্যমান। দক্ষিণ ওড়িশার মালকানগিরির কৃষক সমাজের দ্বিভাষিক গ্রামীণ জীবনধারা থেকে শুরু করে কটক-ভুবনেশ্বরের আধুনিক পেশাজীবী বাঙালি সমাজ—সবাই মিলে প্রমাণ করেছেন যে, ওড়িশার বাঙালিরা কোনো বিচ্ছিন প্রবাসী গোষ্ঠী নন; বরং তারা ওড়িশার নদী, মাটি, শিল্প ও সামগ্রিক ইতিহাসের পলিস্তরে মিশে থাকা এক চিরন্তন আত্মিক শক্তি।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।