,

কর্ণাটকে বাঙালি জনবসতি, প্রযুক্তি-অভিযাত্রা ও ঐতিহ্যের ইতিহাস

দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে অবস্থিত কানাড়া বা কন্নড় ভূখণ্ড এবং প্রাচ্য ভারতের বঙ্গভূমির ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক। কিন্তু ইতিহাস ও সামাজিক বিবর্তনের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই দুই সুপ্রাচীন সভ্যতার সংযোগ কেবল আধুনিক প্রযুক্তির যুগে তৈরি হয়নি; বরং এর আত্মিক, বৌদ্ধিক ও অর্থনৈতিক শিকড় বহু শতকের গভীরে প্রোথিত। প্রাচীন বিজয়নগর সাম্রাজ্য, মহীশূর রাজ্য এবং আরব সাগরের কোলঘেঁষা ম্যানগ্যালোর ও কারওয়ার বন্দরের সমুদ্রবাণিজ্যিক রুটের মাধ্যমে বঙ্গীয় ও কন্নড় সংস্কৃতির প্রথম পরোক্ষ পরিচয় ঘটেছিল। তবে আধুনিক কর্ণাটকে বাঙালি জনবসতির প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার, রূপান্তর ও স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে মূলতঃ তিনটি ঐতিহাসিক পর্বে—ষোড়শ শতকের বৈষ্ণবীয় ভাবান্দোলন, ঔপনিবেশিক আমলের উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চা, এবং একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত তথ্যপ্রযুক্তি (IT) বিপ্লব।

কর্ণাটকের মাটিতে বঙ্গীয় মননের প্রথম গভীর ও কালজয়ী আধ্যাত্মিক স্পর্শটি ঘটেছিল ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিখ্যাত দাক্ষিণাত্য ভ্রমণের মাধ্যমে। ১৫১০-১৫১১ খ্রিস্টাব্দের দিকে গোয়া ও উত্তর কানাড়া সীমান্ত পার হয়ে শ্রীচৈতন্য যখন উদুপি (Udupi), শ্রিঙ্গেরী, গোকর্ণ এবং উদুপির প্রখ্যাত মাধ্বমঠে পদার্পণ করেন, তখন থেকে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম ও কর্ণাটকের শ্রীমাধবাচার্য প্রতিষ্ঠিত দ্বৈতবাদী দর্শনের মধ্যে এক প্রজ্ঞাময় সংলাপ সূচিত হয়। উদুপির শ্রীকৃষ্ণ মন্দির এবং শৃঙ্গেরী সারদা পীঠের সেই ঐতিহাসিক সফর কেবল শাস্ত্রীয় ভাববিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা কন্নড়ভূমির প্রজ্ঞানুসন্ধানী মানুষ ও বঙ্গীয় বৈষ্ণব দর্শনের মধ্যে এক অমলিন আত্মিক সেতু নির্মাণ করেছিল, যা পরবর্তীতে বহু বাঙালি সাধু, দর্শনার্থী ও শাস্ত্রবিদকে কর্ণাটকের ধর্মীয় পীঠগুলোতে আকৃষ্ট করে।

উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের সূচনালগ্নে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক সম্প্রসারণ, ব্যাঙ্গালোর ক্যান্টনমেন্ট গড়ে ওঠা এবং মহীশূর রাজাদের প্রগতিশীল শাসনের হাত ধরে কর্ণাটকে আধুনিক বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের আগমন ঘটে। ১৯০৯ সালে মহীশূরের দূরদর্শী মহারাজা চতুর্থ কৃষ্ণরাজ ওয়াদিয়ার ও জামসেটজি টাটার যৌথ প্রয়াসে বেঙ্গালুরুতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সাইন্স’ (IISc)। আধুনিক ভারতের বিজ্ঞানসাধনার এই তীর্থক্ষেত্রটি প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকেই বহু প্রখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী ও গবেষকের কর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়। ভারতের বিজ্ঞান আন্দোলনের অগ্রদূত স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ এবং পরবর্তী প্রজন্মের বহু প্রজ্ঞাবান বাঙালি গবেষকের নিয়মিত যাতায়াত ও জ্ঞানচর্চা ব্যাঙ্গালোরকে ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্রে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্বাধীনোত্তর ভারতের সামরিক ও মহাকাশ গবেষণার প্রয়োজনে বেঙ্গালুরুকে কেন্দ্র করে যখন হিন্দুস্থান অ্যারোনোটিক্স লিমিটেড (HAL), ভারত ইলেকট্রনিক্স (BEL), ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস (BHEL) এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন দেশের সেরা বাঙালি বিজ্ঞানী, অ্যারোনটিক্যাল প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা কর্ণাটকে এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন।

উচ্চবিত্ত প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি কর্ণাটকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বুননে বাঙালি কারিগর সমাজের এক নীরব অথচ অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। অবিভক্ত বাংলার মেদিনীপুর, হুগলী, বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে আসা অত্যন্ত দক্ষ বাঙালি স্বর্ণশিল্পীরা বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই ব্যাঙ্গালোরের ঐতিহাসিক অ্যাভিনিউ রোড, চিকপেট ও নগরথপেট অঞ্চলে কন্নড় অলংকারশিল্পের প্রধান কারিগর হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁদের হাতের সূক্ষ্ম নকশা ও অলংকারশৈলী মহীশূর ও প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী সোনা ও রূপার অলংকারশিল্পে এক অনন্য মিশ্রণ ঘটায়। একইভাবে অবকাঠামো নির্মাণ, পোশাক শিল্প, হোটেল ও চিকিৎসা সেবা খাতে হাজার হাজার শ্রমজীবী বাঙালি কর্ণাটকের দ্রুত বর্ধনশীল নগর কাঠামোর অপরিহার্য অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছেন।

বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক এবং একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ব্যাঙ্গালোর যখন ভারতের ‘আইটি রাজধানী’ বা ‘সিলিকন ভ্যালি’ হিসেবে আন্তর্জাতিক আত্মপ্রকাশ ঘটায়, তখন কর্ণাটকে বাঙালি অভিবাসনের সবচেয়ে বড় ও বৈপ্লবিক ঢেউটি আসে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান (যেমন উইপ্রো, ইনফোসিস, টিসিএস) এবং বৈশ্বিক টেক-জায়ান্টগুলোর মূল কার্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্র বেঙ্গালুরুতে গড়ে ওঠায় পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে লক্ষাধিক তরুণ সফটওয়্যার প্রকৌশলী, ডেটা সায়েন্টিস্ট, অ্যানালিস্ট ও করপোরেট নির্বাহী কর্ণাটকে আসেন। বেঙ্গালুরুর কোরমঙ্গলা, ইন্দিরানগর, হোয়াইটফিল্ড, ইলেকট্রনিক সিটি, সারজাপুর এবং মারাতাহাল্লির মতো আধুনিক উপশহরগুলোতে আজ বাংলাভাষী তরুণ পেশাজীবীদের উপস্থিতি অত্যন্ত দৃশ্যমান ও স্বতঃস্ফূর্ত।

কর্ণাটকে বসবাসকারী বিশাল বাঙালি সমাজ কেবল নিজেদের জীবিকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা সযত্নে ধরে রেখেছে নিজেদের ভাষা, শিল্প ও সাংস্কৃতিক ধারাকে। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন ব্যাঙ্গালোর’ (BAB)-এর উলসুর লেক সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা আজ দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ বঙ্গীয় উৎসব হিসেবে খ্যাত। বর্তমানে ব্যাঙ্গালোর, মহীশূর ও ম্যাঙ্গালোরে আয়োজিত শতাধিক সর্বজনীন দুর্গাপূজা, রবীন্দ্রজয়ন্তী, পয়লা বৈশাখ ও পৌষ সংক্রান্তির উৎসবে কেবল বাঙালি নয়, স্থানীয় কন্নড় ও অন্যান্য প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের মানুষও সমান আনন্দে অংশ নেন। দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের ফলে বহুপ্রজন্মের বাঙালিরা যেমন সাবলীলভাবে কন্নড় ভাষা ও খাবার আপন করে নিয়েছেন, তেমনি কন্নড় সমাজও বাঙালির সাহিত্যপ্রীতি ও প্রজ্ঞাকে সম্মান জানিয়ে গ্রহণ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে কর্ণাটকের বাঙালিরা আজ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রবাস গোষ্ঠী নয়; বরং তারা দাক্ষিণাত্যের এই সমৃদ্ধ ও আধুনিক রাজ্যের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য শক্তি।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।