বিশ্বের মহাসাগরের যে বিশাল জলরাশি কোনো দেশের সীমানায় পড়ে না, সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জাতিসংঘের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ‘উন্মুক্ত সমুদ্র চুক্তি’। আশা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের মধ্যেই এটি আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে কার্যকর হবে।
জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে, ২০২৩ সালের জুন মাসে এই চুক্তি গ্রহণ করে দেশগুলো। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ৪৯টি দেশ এতে সই করেছে। কার্যকর হতে হলে প্রয়োজন ৬০টি দেশের অনুস্বাক্ষর, তারপর ১২০ দিনের মধ্যে এটি আইনে পরিণত হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে বিষয়টি কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে। যদিও বাইডেন প্রশাসন এতে সই করেছে, ট্রাম্পের আমলে এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
কেন প্রয়োজন এই চুক্তি?
বিশ্বের মহাসাগরের ৬০ শতাংশই কোনো দেশের মালিকানার বাইরে। দেশগুলোর উপকূল থেকে ৩৭০ কিলোমিটার (২০০ নটিক্যাল মাইল) দূরের জলরাশি আন্তর্জাতিক জলসীমা হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলেই খনিজ আহরণ, মাছ ধরা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলছে প্রায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। এই বিশাল জলরাশি রক্ষায়ই মূলত এই চুক্তির উদ্যোগ।
বিশেষ করে ‘দ্য এরিয়া’ নামে পরিচিত গভীর সমুদ্রের সেই অংশ, যেটা বিশ্বের মোট সমুদ্রতলের অর্ধেকের বেশি জুড়ে রয়েছে, সেটিকেও এই চুক্তির আওতায় আনা হচ্ছে।
কী থাকছে এই চুক্তিতে?
১️⃣ সমুদ্র রক্ষায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটি:
চুক্তি কার্যকর হলে ‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস’ (কপ) নামে একটি কমিটি গঠন হবে। এই কমিটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে সমুদ্রের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা ও পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
২️⃣ সুরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা:
এখন পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার বেশিরভাগ উদ্যোগ দেশগুলোর নিজস্ব জলসীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলসীমাতেও সংরক্ষিত এলাকা গড়ে তোলা হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘কপ’-এর সদস্যদের সম্মতির ভিত্তিতে এই এলাকা নির্ধারণ হবে। তবে কোনো দেশ বাধা দিলে তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের ভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
৩️⃣ সম্পদের ভাগাভাগি:
উন্মুক্ত সমুদ্রের প্রাণী, উদ্ভিদ বা অণুজীব থেকে পাওয়া জেনেটিক উপাদান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধনী-গরিব দেশগুলোর মধ্যে লাভ ভাগাভাগির নীতিমালা থাকবে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর গবেষণা সুবিধা, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হবে।
কোনো পণ্য বিক্রি হলে লাভের একটা অংশও ভাগাভাগি হতে পারে। এই নিয়মও ঠিক করবে ‘কপ’।
৪️⃣ পরিবেশগত প্রভাব যাচাই:
সমুদ্রে যেকোনো কাজ শুরুর আগে তার পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদি সেই কার্যক্রম পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে তা অনুমোদন দেওয়া হবে না।
এছাড়া, কোনো কাজ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি হলে সেই অনুমতি বাতিলেরও ব্যবস্থা থাকবে।
৫️⃣ নজরদারি ও আইন প্রয়োগ:
বড় চ্যালেঞ্জ হলো — এত বিশাল সমুদ্র এলাকায় নিয়মকানুন কার্যকর রাখা। এজন্য স্যাটেলাইট নজরদারি এবং পতাকা বহনকারী জাহাজগুলোর ওপর দায় চাপানো হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেআইনি খনিজ আহরণ, মাছ ধরা এবং পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে এটিই হবে বড় পরীক্ষা।
পরিশেষে:
এ চুক্তি শুধু উন্মুক্ত সমুদ্র রক্ষার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিশুদ্ধ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। চুক্তিটি কার্যকর হলে, প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক জলসীমা রক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক আইন কার্যকর হবে।
