,

ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—রোববার এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাতে ইশরাক নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ খবর অস্বীকার করেন। ফলে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে।

সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়। রাত ১০টা ৩৪ মিনিটে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনেও এ-সংক্রান্ত একটি স্ক্রল প্রচার করা হয়। তাতে লেখা ছিল, ‘মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর’।

তবে রাত পর্যন্ত সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ইশরাক তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, তাঁকে পদত্যাগের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। এ কারণে পদত্যাগের নির্দেশসংক্রান্ত খবরটির সত্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান ঘিরে বিতর্ক

শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তাঁর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে কয়েকজনকে ধরার নির্দেশ দিচ্ছেন।

ভিডিওর একটি অংশে তাঁর পাশে থাকা এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীদের কয়েকজনকে কয়েকজন ব্যক্তির দিকে দৌড়ে যেতে দেখা যায়। তাঁদের একজন এক তরুণকে লাথি মারেন। ভিডিওতে কয়েকজনকে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে অনুনয় করতেও শোনা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্য রয়েছে।

ঘটনাস্থলে ইশরাকের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেওয়া দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও উপস্থিত ছিলেন। ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের হাতেও অস্ত্র ছিল। ভিডিওর কিছু অংশে ইশরাকের হাতে থাকা পিস্তল অস্পষ্ট করে দেওয়া হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একজন প্রতিমন্ত্রী নিজে অস্ত্র হাতে নিয়ে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মাদকবিরোধী কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি না থাকলেও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে থাকা উচিত বলে বিএনপি ও সরকারসংশ্লিষ্ট কয়েকজন মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির দিনেই বিতর্ক

শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন তিনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নয়নে সময়সীমাও বেঁধে দেন।

প্রধানমন্ত্রীর এসব পরিদর্শন নিয়ে যখন সরকারি সেবা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর আলোচনা চলছিল, সেদিন বিকেলেই ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানের ভিডিও সামনে আসে। দল ও সরকারসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের মতে, ঘটনাটি সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন ঘিরে তৈরি হওয়া ইতিবাচক আলোচনাও আড়ালে পড়ে যায়।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে থাকেনি; বরং তা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদেরও বিব্রত করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর আচরণের দায় সরকারকেও বহন করতে হয় বলে তিনি মনে করেন।

অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়ে ইশরাকের ব্যাখ্যা

সমালোচনার মুখে রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি বিবৃতি দেন ইশরাক হোসেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনি গেন্ডারিয়ায় গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে ওই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।

ইশরাক জানান, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তবে তাঁর মতে, এসব উদ্যোগে সমস্যার সমাধান হয়নি।

বিবৃতিতে ইশরাক বলেন, অভিযানে যাওয়ার আগে তিনি জানতে পারেন, মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে। একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন বলে তিনি দাবি করেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয় বলেও তিনি জানান।

নিজের হাতে থাকা পিস্তলটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত বলে দাবি করে ইশরাক বলেন, আত্মরক্ষার জন্যই তিনি সেটি প্রদর্শন করেছিলেন এবং এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

অভিযান সম্পর্কে তাঁর আরও দাবি, সেখানে চার থেকে পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এসব স্থান থেকে মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন জব্দ করা হয়। ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। তাঁর অভিযোগ, কয়েকটি গণমাধ্যম ঘটনার খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরেছে। মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন

অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শনিবার ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে অভিযানের বিষয়ে অবহিত করেননি; পরে তাঁরা ঘটনাটি জানতে পারেন। ইশরাকও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন।

এদিকে, অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযানের সময় আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে—এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না। ইশরাকের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এই বিধানের প্রয়োগ প্রাসঙ্গিক কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা।

পদত্যাগের খবরকে গুজব বললেন ইশরাক

রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া আরেকটি পোস্টে ইশরাক দাবি করেন, তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর সঠিক নয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাঁকে পদত্যাগের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি এবং তাঁর পদত্যাগের প্রশ্নও ওঠেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, একটি মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে।

সাংবাদিকদের জন্য খোলা তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও একটি অডিও বার্তা পাঠান ইশরাক। সেখানে তিনি বিষয়টিকে গুজব হিসেবে বিবেচনা করার অনুরোধ জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দল থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে; অনির্ভরযোগ্য খবরের ভিত্তিতে নয়।

তবে এর আগে সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমেও তা প্রচার করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসায় দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে বিরোধ থেকেই যায়।

এর আগে পদত্যাগ করেছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি

ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবরের আগে বিতর্কিত একটি ঘটনার পর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকেও পদ ছাড়তে হয়েছিল।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজনের নাম সামনে আসে। ঘটনাটি নিয়ে দল ও সরকারের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক দায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যদিও হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন মিষ্টি।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। পরে সংসদ সচিবালয় তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে।

মিষ্টির পদত্যাগের প্রায় আড়াই সপ্তাহের মধ্যে ইশরাককে ঘিরে নতুন বিতর্ক সামনে এল। দুটি ঘটনাতেই দল ও সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ইশরাকের ক্ষেত্রে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রচারিত খবর তিনি নিজেই অস্বীকার করেছেন। সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসা পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রিসভায় থাকা বা পদত্যাগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।