ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় ওয়াজ মাহফিল শুনতে যাওয়ার পথে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে অপহরণ করে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ছয়জনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে সরাইল থানায় মামলা করেছেন। মামলার পর অভিযান চালিয়ে বাহার মিয়া নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত ৭ অক্টোবর রাতে উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের বাড়িউড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে পরিবারের সদস্য ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন জাকির মিয়া (৩৩), নাঈম (২৪), সোহাগ মিয়া (২১), মোকলেস (৫২), আলামিন ওরফে জিকির (৪০) এবং বাহার মিয়া (২২)। তাঁরা সবাই একই ইউনিয়নের বাড়িউড়া গ্রামের বাসিন্দা।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ওই গ্রামের একটি মাদ্রাসার মাঠে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। মাহফিল শুনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল কিশোরীটি। পথে অভিযুক্তরা তার মুখ চেপে ধরে জোর করে একটি অটোরিকশায় তুলে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাকে নদীতীরের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সেখানে জাকির মিয়া, নাঈম ও সোহাগ মিয়া কিশোরীটিকে ধর্ষণ করেন। অন্য অভিযুক্তরাও তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে কিশোরীকে বাড়ির কাছাকাছি ফেলে রেখে চলে যান অভিযুক্তরা। এ সময় কাউকে ঘটনার কথা জানালে তাকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিশোরী
ঘটনার পর শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কিশোরীটি পরিবারের সদস্যদের কাছে নির্যাতনের কথা জানায়। পরে গত বৃহস্পতিবার তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক রতন কুমার ঢালী জানান, ঘটনার বেশ কয়েক দিন পর কিশোরীকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। এ কারণে প্রয়োজনীয় আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে আরও তথ্য জানা যাবে।
আপসের আশ্বাসে মামলা করতে দেরি, পরিবারের অভিযোগ
কিশোরীর পরিবারের দাবি, ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি তাদের ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তাঁরা পরিবারকে থানায় অভিযোগ না করার পরামর্শ দেন। তাঁদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে পরিবার শুরুতে পুলিশের কাছে যেতে দেরি করে।
কিশোরীর বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় ওই ব্যক্তিরা দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারেননি। ফলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার আশায় শনিবার রাতে তাঁর স্ত্রী সরাইল থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন।
পরিবারের অভিযোগ, গুরুতর অপরাধের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে আপসের আশ্বাস দেওয়ার কারণে বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কিংবা অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলা হওয়ার পরপরই অভিযান চালিয়ে বাহার মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে।
দ্রুত বিচারের দাবি মহিলা পরিষদের
এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখা। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শামীমা শিকদার বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দায় এড়াতে না পারেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ওঠায় সুষ্ঠু তদন্ত, প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অপরাধের দায় আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।









