রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী এবং ছাত্রদল নেতা জাহিদুল ইসলাম পারভেজ (২৩) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। দাখিলকৃত এই চার্জশিটে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যয়নরত দুই ছাত্রীসহ সর্বমোট ৯ জন শিক্ষার্থীকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে।
রোববার (৩১ মে) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বনানী থানার দায়িত্বরত পুলিশ পরিদর্শক এ কে এম মঈন উদ্দিন ঢাকার চিফ মেট্রেপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে এই অভিযোগপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করেন। একই সঙ্গে মামলার দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ায় অপরাধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা বা অভিযোগের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় অন্য আরও আটজনকে এই মামলার দায় থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে পুলিশ।
প্রক্টর অফিসের মীমাংসা ও হত্যাকাণ্ডের প্ররোচনা
হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মূল ঘটনার পূর্বে জাহিদুল ইসলাম পারভেজের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভ্যন্তরীণ বিরোধ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে উভয় পক্ষকে ডেকে বিষয়টির একটি আনুষ্ঠানিক মীমাংসা করে দেওয়া হয়। প্রক্টরিয়াল বডির উপস্থিতিতে সেই মীমাংসা বৈঠকের পর জাহিদুল ইসলাম পারভেজ নিজে সবার কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
তবে বনানী থানা পুলিশের দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রক্টর অফিসে বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে মীমাংসা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ঐশী ও টিনার চরম প্ররোচনা এবং উসকানির কারণেই পারভেজকে নৃশংসভাবে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন করা হয়। এই দুই ছাত্রীর প্রত্যক্ষ প্ররোচনাই হত্যাকাণ্ডটিকে ত্বরান্বিত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেছেন।
ঘটনার বিবরণ ও পূর্ববর্তী আইনি পদক্ষেপ
নথিভুক্ত মামলার বিবরণ ও প্রাসঙ্গিক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৯ এপ্রিল রাজধানীর বনানী থানা এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরিকাঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম পারভেজকে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া সবাই প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েরই বিভিন্ন বিভাগের নিয়মিত শিক্ষার্থী।
হত্যাকাণ্ডের ওই নির্দিষ্ট দিন রাতেই নিহত পারভেজের শোকার্ত পরিবারের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে বনানী থানায় একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলা দায়েরের পর থেকেই পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ ও প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে নিবিড় তদন্ত শেষে এই ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অপরাধের খসড়া প্রতিবেদন জমা দেয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দাবি
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ও ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে এমন সহিংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি সাধারণ শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সচেতন মহলে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। এই ঘটনার পর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে দেশের সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং ডায়াগনস্টিক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং যেকোনো ধরনের শৃঙ্খলা পরিপন্থী অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়মিত তদারকি ও ত্বরিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়।
একই সাথে উচ্চশিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে ক্যাম্পাসগুলোতে বহিরাগত ও অপরাধপ্রবণ শিক্ষার্থীদের আনাগোনা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আহ্বান জানানো হয়েছে। বনানী থানা পুলিশ জানিয়েছে, আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়ার পর এখন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচার কাজ শুরু হবে, যার মাধ্যমে অপরাধীরা তাদের উপযুক্ত শাস্তি পাবে।
