ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ৫১ জন নিহত হয়েছেন। শনিবার সকালে পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে আরও ১১৩ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৬ জনের অবস্থা গুরুতর, আর ৭৭ জন সামান্য আহত হয়েছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের পরপরই বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধস, সড়ক ধসে পড়া এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে দুর্গত এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন—এমন আশঙ্কায় উদ্ধারকারী দলগুলো ধসে পড়া ভবন ও স্থাপনার আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।
মূল ভূমিকম্পের পর প্রায় ৩৪১টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। একের পর এক কম্পনে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেক বাসিন্দা বাড়িঘর ছেড়ে খোলা জায়গা, বারান্দা কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে রাত কাটাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি সিক্কা। সেখানে ৩ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিজেদের উদ্যোগে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে সরে গেছেন। ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক পরিবার এখন স্থায়ী আশ্রয়ের অনিশ্চয়তায় রয়েছে। পরাঘাত অব্যাহত থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় অবস্থান করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাউমেরে শহরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আহত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালের পাশাপাশি বাইরে তাঁবু স্থাপন করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়তি চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। গুরুতর আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদেরও পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
প্রাথমিক হিসাবে, ভূমিকম্পে ১ হাজার ৩০০টির বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বহু এলাকায় এখনো ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও অন্যান্য স্থাপনার প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। উদ্ধারকারীরা সম্ভাব্য জীবিতদের সন্ধানে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছেন। পরাঘাতের ঝুঁকি থাকায় ধসে পড়া ভবনের কাছে অভিযান চালানোও বাড়তি সতর্কতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদ্ধার তৎপরতায় সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ভূমিধস। পাহাড়ি মাটি ও ধ্বংসাবশেষ সড়কের ওপর পড়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাদ্য, পানি ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দিতে সময় বেশি লাগছে। দুর্গম অঞ্চলে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন না হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো আরও কঠিন হতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি তাঁরা নিরাপত্তা নিশ্চিত, ধ্বংসস্তূপ অপসারণ এবং দুর্গত মানুষের সহায়তায় কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সচল করা এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করাও তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।
ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেরটামিনার ২০টি পেট্রোল স্টেশন বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্গত এলাকায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উদ্ধারকারী যানবাহন ও অন্যান্য জরুরি পরিবহন পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর পরাঘাত ও ভূমিধসের ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এবারের ঘটনায়ও সেই ঝুঁকি স্পষ্ট হয়েছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশের আগে নিরাপত্তা যাচাই, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে রাখা এবং জরুরি চিকিৎসা ও আশ্রয় নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এ মুহূর্তে উদ্ধার অভিযান, চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন সবচেয়ে জরুরি। পরাঘাতের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। ফলে উদ্ধারকারী সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যেতে হবে, যাতে ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করা যায় এবং দুর্গত পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়।









