অর্থ পাচার আর সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ঠেকানোর জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (BFIU)। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাকে রাজনৈতিক আজ্ঞাবহ বানানোর যে নজির সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, তা দেশের আইনি শাসন ও আর্থিক নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে ইতিহাস ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএফআইইউ-এর ভূমিকা এবং ২০২৪ সালে পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের ভূমিকার মধ্যে মৌলিক এক বড় পার্থক্য রয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমল: সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও নিজস্ব লোকজনের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে বিএফআইইউ-এর নাম আলোচনায় এসেছে মূলত সুনির্দিষ্ট আর্থিক অপরাধের অনুসন্ধানের সূত্র ধরে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হয়, তখন বিএফআইইউ সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই প্রথম কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া কিংবা এনামুল হক এনু ও রূপন ভূঁইয়ার মতো ক্ষমতাসীন দল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ ও অনুসন্ধানের কাজ করেছিল এই সংস্থাটি।
২০১৯ সালের নভেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যখন বিএফআইইউ-এর কাছে ১০৫ জনের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চায়, সেই তালিকায় আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তার নাম ছিল। অর্থাৎ, কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের উদ্দেশ্যে নয়, বরং অভিযোগ উঠলে ক্ষমতাসীন দলের নিজেদের লোকদের বিরুদ্ধেও বিএফআইইউ-কে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এমনকি বিরোধী কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রেও বিএফআইইউ-এর কাছে সুনির্দিষ্ট নথিপত্র ও আইনি ভিত্তি ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষেত্রে যে তদন্ত হয়েছিল, তার পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং পরবর্তীতে আইনগত প্রক্রিয়ায় তার প্রমাণও এসেছে।
একইভাবে, আরাফাত রহমান কোকোর ব্যাংক হিসাবের তথ্য যখন বিএফআইইউ চায়, তার অনেক আগেই আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অপরাধের সুনির্দিষ্ট ও নথিভুক্ত ইতিহাস ছিল। সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়ায় ২০১২ সালে সেখান থেকে পাচারকৃত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাঘারে ফেরতও আনা হয়েছিল।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিএফআইইউ যখন রাহাত আল মাহী এরশাদ (সাদ এরশাদ), কোকো কিংবা আওয়ামী লীগ নেতা সম্রাট ও তৎকালীন মন্ত্রী মায়ার ছেলে দীপুর ব্যাংক তথ্য তলব করে, সেই তালিকায় সরকারি-বিরোধী উভয় শিবিরের অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তথ্য-প্রমাণ বলে, আওয়ামী লীগ সরকার বিএফআইইউ-কে স্রেফ বিরোধী দল দমনের ঢালাও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেনি; বরং প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের ভিত্তিতেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ পরবর্তী বাস্তবতা: একচ্ছত্র ক্ষমতার নগ্ন রাজনৈতিক রূপ
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএফআইইউ-এর চেহারা পুরোপুরি বদলে গেছে। দুর্নীতি দমন ও অর্থ পাচার রোখার জন্য সংস্থাসমূহকে যে ব্যাপক আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিএনপি ঘরাণার রাজনৈতিক সমীকরণে তা একচ্ছত্র রাজনৈতিক হাতিয়ারে রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের তদন্ত বা আইনি তথ্যের তোয়াক্কা না করে স্রেফ রাজনৈতিক তালিকার ওপর ভিত্তি করে গণহারে হিসাব স্তব্ধ করা হচ্ছে। বিরোধী মত দমন ও রাজনৈতিকভাবে কাবু করার জন্য এই রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে এখন যেভাবে সরাসরি ও নগ্নভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিএফআইইউ-এর প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আইনের দোহাই দিয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতা
২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২৩ ধারা বিএফআইইউ-কে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়েছে। কোনো বিচারিক নির্দেশ বা আদালতের পূর্বানুমতি লাগে না। সংস্থাটি চাইলেই নিজ খেয়ালখুশিমতো ‘সুও মোটো’ (স্বপ্রণোদিত) ক্ষমতায় যেকোনো নাগরিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করতে পারে। বন্ধ বা ফ্রিজ করে দিতে পারে ৩০ দিনের জন্য, যা পরে ইচ্ছেমতো বাড়ানো যায়।
কাগজে-কলমে বলা হয়, দ্রুত অর্থ পাচার ঠেকানোর জন্য এই ক্ষমতার বিধান। কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মোক্ষম অস্ত্রে। বিএফআইইউ মূলত একটি আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট। এদের কাজ তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সিআইডি বা দুদকের মতো তদন্তকারী সংস্থার কাছে পাঠানো। কিন্তু সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে সংস্থাটি নিজেই এখন বিচারক ও সাজাদাতার ভূমিকায় নেমে পড়েছে।
ক্ষমতার বদল আর ঢালাও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ
ক্ষমতার পালাবদল হলেই বিএফআইইউ-এর নিরপেক্ষতার মুখোশ খুলে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কথাই ধরা যাক। কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত বা আইনি শুনানি ছাড়াই স্রেফ ওপর মহলের নির্দেশে ও রাজনৈতিক তালিকা দেখে এক রাতেই শত শত মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা শুরু হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ মন্ত্রী-এমপিদের হিসাব তো অবরুদ্ধ হলোই, বাদ পড়েনি দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোও। বেক্সিমকো, সামিট, এস আলম কিংবা ওরিয়ন গ্রুপের মতো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হিসাব কোনো চূড়ান্ত প্রমাণের আগেই রাতারাতি বন্ধ করা হলো। অপরাধীর বিচার হওয়া ভিন্ন কথা, কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে পুরো একটি গোষ্ঠীর আর্থিক পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার এই কৌশল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক।
‘সন্দেহে’র অস্পষ্টতা ও নাগরিক অধিকার হরণ
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২৩ ধারায় বলা আছে ‘যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ’-এর কথা। কিন্তু কাকে সন্দেহ করা হবে আর কাকে নয়—তার কোনো পরিষ্কার মানদণ্ড আইনে নেই। রাজনৈতিক টেবিল থেকে তালিকা এলেই বিএফআইইউ-এর চোখে রাতারাতি যে কেউ ‘সন্দেহভাজন’ হয়ে যান।
সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা তথ্য তলব করার আগে সংশ্লিষ্ট নাগরিককে জানানোও হয় না। সকালে এটিএম কার্ড ব্যবহার করতে গিয়ে বা ব্যাংকে চেক জমা দিতে গিয়ে একজন মানুষ প্রথম জানতে পারেন তিনি আর্থিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ তার নেই। আর আইনের ২৪ ধারায় ‘সরল বিশ্বাসে কৃত কাজের সুরক্ষা’ দিয়ে রাখা হয়েছে বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের। অর্থাৎ, কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক নির্দেশে কারও জীবন বরবাদ করে দিলেও তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করা যাবে না।
সালমান মুক্তাদির ও নজরদারির নতুন শিকার
রাজনীতিবিদ আর শিল্পপতিদের হিসাব কষে থামেনি বিএফআইইউ। এদের নজরদারির থাবা এখন সোশ্যাল মিডিয়া আর বিনোদন জগতেও বিস্তৃত। অতি সম্প্রতি জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের সব ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের ইতিহাস চেয়ে দেশের সব ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছে বিএফআইইউ।
কোনো নির্দিষ্ট মানি লন্ডারিং বা জঙ্গি অর্থায়নের তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই স্রেফ সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার সূত্রে কীভাবে সাধারণ নাগরিকদের ওপর আর্থিক গোয়েন্দাগিরি চালানো হয়, সালমান মুক্তাদিরের ঘটনাই তার বড় প্রমাণ।
রাষ্ট্রীয় আর্থিক নিরাপত্তার নামে গড়ে তোলা একটি প্রতিষ্ঠান যখন আইন, আদালত ও নাগরিক অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শাসনযন্ত্রের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে, তখন তাকে আর যাই হোক স্বাধীন গোয়েন্দা সংস্থা বলা যায় না। এটি তখন পরিণত হয় ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখা কিংবা প্রতিপক্ষ পিষে মারার এক নগ্ন প্রশাসনিক হাতিয়ারে।









