,

মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানে ফাঁকা ফুটপাত

রাজধানীর মিরপুরের ফুটপাত ও সড়কের চিত্র এক দিনের ব্যবধানে অনেকটাই বদলে গেছে। ১০ নম্বর গোলচত্বরসহ আশপাশের এলাকায় আগে যেখানে হকারদের দোকান, পণ্য ও ক্রেতাদের ভিড়ে পথচারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ত, সেখানে এখন অনেকটাই ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে। যানজটও আগের তুলনায় কমেছে। ফুটপাত দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারছেন সাধারণ মানুষ।

গত বুধবার হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নতুন করে অভিযান চালায়। এরপর থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত থেকে হকারদের উপস্থিতি কমতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার মিরপুরের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে ফুটপাতে হকারের উপস্থিতি খুব কম দেখা গেছে।

সরেজমিনে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে ১৪ নম্বর, ২ নম্বর গোলচত্বর, ১২ নম্বর ও শেওড়াপাড়া এলাকায় দেখা যায়, অধিকাংশ ফুটপাতই ফাঁকা। যেসব স্থানে প্রতিদিন সকাল থেকে হকাররা পোশাক, জুতা, খাবারসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বসতেন, সেখানে বৃহস্পতিবার তেমন কোনো দোকান ছিল না। কয়েকটি টং দোকানের খাঁচা পড়ে থাকলেও সেগুলোতে পণ্য সাজিয়ে বিক্রি করতে দেখা যায়নি। কিছু হকারকে অবশ্য আশপাশের এলাকায় ঘোরাফেরা করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে।

ফুটপাত খালি থাকায় পথচারীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেলেও হকারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিন ফুটপাতে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক হকার বলছেন, হঠাৎ করে বসার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের আয় বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মিরপুর হোপ স্কুলের পাশে পোশাক বিক্রি করা এক হকার বলেন, ‘আমরা এখন কী করে খাব? সরকার আমাদের বসার জায়গা করে দিক। তা না হলে বসতে দিক।’

স্থানীয় একটি পোশাকের শোরুমের কর্মী রুমন ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে মিরপুর এলাকায় হকারের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তার অংশেও দোকান বসানো হতো। ফলে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হতো।

পুনর্বাসনের দাবি হকারদের

বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, শুধু উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে হকার উচ্ছেদ করা হলে শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা সংকটে পড়বে বলে তিনি দাবি করেন।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ, তাঁদের তালিকা তৈরি, হকার আইন প্রণয়ন এবং উচ্ছেদ ও হয়রানি বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি হকারদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

অভিযান চলবে: ডিএনসিসি

মিরপুর-১০ নম্বরে উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে সংঘর্ষে আহত সাংবাদিক সিফাতকে বৃহস্পতিবার পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসায় দেখতে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি আহত সাংবাদিকের স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন।

পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, ফুটপাতের অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে হকার ব্যবস্থাপনা ও উচ্ছেদ কার্যক্রম নিয়ে কারও সুপরামর্শ থাকলে তা বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

ফুটপাত আবার দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, জনগণের চলাচলের জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত রাখা হবে। কেউ পুনরায় সেখানে বসলে আরও কঠোরভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

নির্ধারিত স্থান ছাড়া হকার নয়: ডিএসসিসি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালামও জানিয়েছেন, নির্ধারিত স্থান ছাড়া রাজধানীর অন্য কোথাও হকার বসতে দেওয়া হবে না। বৃহস্পতিবার ধলপুর এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং জনভোগান্তি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

তিনি জানান, হকারদের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু ফুটপাত ও স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব অনুমোদিত স্থানের বাইরে সড়ক বা ফুটপাত দখল করে হকার বসলে উচ্ছেদের পাশাপাশি মালপত্র জব্দ এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিএসসিসি প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাটের মূল সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত দখল করে কোনো হকারকে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।

সংঘর্ষের ঘটনায় চার মামলা

এদিকে মিরপুরে ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর মডেল থানায় তিনটি এবং কাফরুল থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।

থানা সূত্রে জানা গেছে, চার মামলায় মোট প্রায় এক হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

মিরপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিজানুর রহমান জানান, সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় একটি মামলা করেছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি এবং ট্রাফিক পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে ট্রাফিক পুলিশ বাদী হয়ে তৃতীয় মামলা করেছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ জন।

অন্যদিকে কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সিটি করপোরেশনের গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে মামলা করেছে। এ মামলায়ও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মিরপুরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে একদিকে ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় পথচারীদের চলাচল সহজ হয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থানে ব্যবসা করা হকারদের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে স্থায়ীভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি হকারদের জন্য নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত ব্যবসার জায়গা তৈরি করা যায় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।