কবিতার শব্দকে কণ্ঠে ধারণ করে তা মানুষের অনুভূতি ও চেতনার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে আহকাম উল্লাহ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত এক নাম। আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে দীর্ঘদিনের পথচলায় তিনি কবিতাকে শুধু পরিবেশনের শিল্প হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের মধ্যে মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তচিন্তার চেতনা জাগিয়ে তুলতেও আবৃত্তিকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
আজ ৩০ আগস্ট তাঁর জন্মদিন। ১৯৭০ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া আহকাম উল্লাহ জীবনের ৫৬ বছরে পদার্পণ করছেন। জন্মদিনে সহকর্মী, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ ও তাঁর অনুরাগীরা তাঁকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
আহকাম উল্লাহর পুরো নাম আবুল ফাৎহা মোঃ আহকাম উল্লাহ ইমাম খান। তাঁর ডাকনাম আমল। তাঁর বাবা মোঃ আলী ইমাম খান বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার এবং মা সুফিয়া ইমাম। শৈশব ও শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটানোর পর তিনি সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল ও নটরডেম কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয় দীর্ঘদিন আগে। ধীরে ধীরে আবৃত্তি তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান পরিচয়ে পরিণত হয়। মঞ্চে কবিতার উপস্থাপনা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘স্বরশ্রুতি’র নেতৃত্ব দিয়েছেন। সংগঠনটির কার্যক্রমের মাধ্যমে আবৃত্তি চর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—আবৃত্তিকে ব্যক্তিগত শিল্পচর্চার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা।
বর্তমানে আহকাম উল্লাহ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফের মৃত্যুর পর তিনি সর্বসম্মতিক্রমে এই দায়িত্বে আসেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনাও রয়েছে। তিনি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গঠনের পক্ষে কথা বলে আসছেন। সংস্কৃতি চর্চার বিস্তার এবং এ খাতে রাষ্ট্রীয় বাজেট ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন।
আহকাম উল্লাহর শিল্পীজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর আবৃত্তির অ্যালবাম প্রকাশ। তাঁর কণ্ঠে বিভিন্ন কবিতার পরিবেশনা শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। স্পষ্ট উচ্চারণ, আবেগের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশ এবং কবিতার ভাবকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আবৃত্তিশৈলীর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিল্প-সংস্কৃতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও তাঁর কর্মপরিচয় রয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে তিনি কর্মজীবনের আরেকটি দিক প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পেশাগত ক্ষেত্রেও তাঁর রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
তবে তাঁর সবচেয়ে পরিচিত পরিচয় আবৃত্তিশিল্পী ও সংস্কৃতিসেবী হিসেবে। দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পথচলায় তিনি মঞ্চের শিল্পী হওয়ার পাশাপাশি সাংগঠনিক দায়িত্বও পালন করেছেন। দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সক্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত করেছে।
জন্মদিনে আহকাম উল্লাহর প্রতি সহকর্মী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা, তাঁর কণ্ঠে কবিতার চর্চা আরও বিস্তৃত হোক। নতুন প্রজন্মের মধ্যে আবৃত্তি ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরিতে তাঁর অভিজ্ঞতা আরও কাজে লাগুক। মানুষের কথা, মানবিকতার কথা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজের আকাঙ্ক্ষা তাঁর শিল্পচর্চায় আরও দীর্ঘদিন প্রতিধ্বনিত হোক।
জীবনের নতুন বছরে তাঁর সুস্বাস্থ্য, সাফল্য ও দীর্ঘ কর্মময় জীবন কামনা করছেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
শুভ জন্মদিন, আহকাম উল্লাহ।








