,

অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা-মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক রফিকুল ইসলামের ৮৪তম জন্মদিন

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাহসী সেনানায়ক, ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার, বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের ৮৪তম জন্মদিন আজ ১৩ সেপ্টেম্বর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা থেকে শুরু করে ১ নম্বর সেক্টরের নেতৃত্ব—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পরও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, রাজনীতি ও লেখালেখির মাধ্যমে তিনি জনজীবনে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৪৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের শাহরাস্তির নাওড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রফিকুল ইসলাম। তাঁর বাবা আশরাফ উল্লাহ এবং মা রহিমা বেগম। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে শৈশব থেকেই তিনি মেধা, শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তার পরিচয় দেন। বাবার সরকারি চাকরির কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর শিক্ষাজীবন কাটে।

১৯৫৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা মডেল হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগেও অধ্যয়ন করেন। পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

মার্চের প্রতিরোধে চট্টগ্রামে নেতৃত্ব

১৯৭১ সালের মার্চে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রামে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের দায়িত্বে ছিলেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য দমন-পীড়ন ও গণহত্যার আশঙ্কা সে সময় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। এমন পরিস্থিতিতে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য আনা অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাস বন্ধে তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বাঙালি শ্রমিক এবং তাঁর অধীনস্থ বাঙালি সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করেন। ২৪ মার্চ রাত থেকেই তাঁর নেতৃত্বে প্রতিরোধের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সশস্ত্র প্রতিরোধ আরও সংগঠিত রূপ নেয়।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সেক্টরের আওতায় ছিল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিরোধ ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

প্রায় নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন। ১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বে থেকে রফিকুল ইসলাম সেই প্রতিরোধযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।

বিজয়ের পরদিন চট্টগ্রামে পতাকা উত্তোলন

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিজয় নিশ্চিত হয়। পরদিন ১৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে মেজর রফিকুল ইসলামের নামও জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ, প্রাণহানি, ত্যাগ ও প্রতিরোধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।

মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে রফিকুল ইসলামকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। বাংলাদেশের সামরিক বীরত্বের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিগুলোর মধ্যে ‘বীর উত্তম’ অন্যতম।

মুক্তিযুদ্ধের পরও বিস্তৃত কর্মজীবন

স্বাধীনতার পর রফিকুল ইসলামের কর্মজীবন থেমে যায়নি। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০-৯১ সালের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি নৌপরিবহন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। চাঁদপুর-৫ আসন থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফলে তাঁর কর্মজীবনে সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি প্রশাসন ও সংসদীয় রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয়।

তবে রফিকুল ইসলামের পরিচয় কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধা, সেনানায়ক বা রাজনীতিবিদ হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞ লেখকও। রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগকে তিনি তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ A Tale of Millions, যার বাংলা রূপ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ মুক্তির সোপানতলে। এসব লেখায় যুদ্ধের সামরিক বাস্তবতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার কথাও উঠে এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক অবদানও স্বীকৃতি পায়।

মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের জীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। একদিকে তিনি ছিলেন রণাঙ্গনের একজন সামরিক নেতা, অন্যদিকে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকারী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। পাশাপাশি তাঁর লেখালেখি মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে।

৮৪তম জন্মদিনে মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানায়ককে স্মরণ করা হচ্ছে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। তাঁর জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় নতুন প্রজন্মের সামনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ত্যাগ এবং প্রতিরোধের বাস্তবতাকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে।

মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের জন্মদিনে তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও শান্তিময় জীবন কামনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর বীরত্ব, নেতৃত্ব ও কর্মজীবনের স্মৃতি দীর্ঘদিন অম্লান থাকুক—এটাই এই দিনে প্রত্যাশা।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।