বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন প্রকাশ্যে ভারতের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে। দিল্লিতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত শু ফেইহং বলেছেন, ওয়াশিংটনের একতরফা শুল্ক আরোপের তীব্র বিরোধিতা করছে বেইজিং। তার ভাষায়, “এই ধরনের কর্মকাণ্ড আসলে দাদাগিরি, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।”
সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়েছিলেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। সেই সময় সীমান্ত নিরাপত্তা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং সহযোগিতার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সামনে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চীন সফর নির্ধারিত। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চীনের রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করে বলেন, মুক্ত বাণিজ্য থেকে বহুদিন ধরে উপকৃত হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র এখন শুল্ককে দরকষাকষির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তার দাবি, “ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর বিরোধিতা করে চীন ভারতের পাশে থাকবে।”
এর আগে ভারত সফরকালে ওয়াং ইও একই সুরে মন্তব্য করেছিলেন— যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বিশ্ব বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ভারত-চীন সম্পর্ককে সাময়িকভাবে কাছাকাছি আনলেও মৌলিক দ্বন্দ্ব অমীমাংসিতই থেকে গেছে। গালওয়ানের সংঘর্ষের পর থেকে সীমান্ত ইস্যু দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
‘মানব রচনা ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজ’-এর উপমন্যু বসু বলেন, “চীন ও ভারত কিছু বিষয়ে একমত হলেও মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। সীমান্ত নির্ধারণ না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে ‘জিন্দল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স’-এর গীতাঞ্জলি সিনহা রায় বলেন, “দুই দেশই নিজ নিজ স্বার্থে আলোচনা করছে। সম্পর্ক ভালো করতে চাইলেও ইতিহাসের ভার আর ভূ-রাজনীতির জটিলতা অস্বীকার করা যায় না।”
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২৭.৭ বিলিয়ন ডলার। রেয়ার আর্থ, সার ও যন্ত্রপাতি নিয়ে সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে। তবুও সীমান্তে চীনের কার্যকলাপ ভারতের উদ্বেগের কারণ রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের জোট ‘কোয়াড’-এর ওপর এই পরিস্থিতির প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও ভারত কোয়াড থেকে সরে আসবে না।
ভারতের বহু-প্রান্তিক কূটনৈতিক কৌশল নিয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে ব্যর্থ বললেও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ভারতের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য এ নীতি কার্যকর।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নয়। ভারতের কাছেও চীনকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দেখা কঠিন। পাকিস্তান প্রশ্নে চীনের অবস্থান ও সীমান্তে টানাপোড়েনের কারণে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সীমিত মাত্রায় সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
উপমন্যু বসুর ভাষায়, “ভারত-চীন বেস্ট ফ্রেন্ড হবে না। কৌশলগত ভারসাম্যই একমাত্র পথ।”
গীতাঞ্জলি সিনহা রায়ও মনে করেন, “চীন কখনোই ভারতের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারবে না।”
