,

গ্যাসের অভাবে ১৯ মাস বন্ধ আশুগঞ্জ সার কারখানা, ক্ষতি ৩ হাজার কোটি টাকা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডে (এএফসিসিএল) গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালুর বিষয়ে সংসদে আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। গত ১ মে থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরুর কথা থাকলেও প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর আরও ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। তবু উৎপাদনে ফিরতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাটি। দীর্ঘ ১৯ মাস ধরে বন্ধ থাকায় কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে, আর দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে।

কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় ৫ কোটি টাকার ইউরিয়া সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এই হিসাবে দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সার উৎপাদনের সুযোগ হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে, কৃষকদের চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে ইউরিয়া আমদানি করতে হচ্ছে বিপুল অর্থ ব্যয়ে। ফলে একদিকে দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানির ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে সরকারকে।

চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল জাতীয় সংসদে নিজ নির্বাচনী এলাকার আশুগঞ্জ সার কারখানাটি পুনরায় চালুর প্রস্তাব দেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ১ মে থেকে কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালুর আশ্বাস দেন। সংসদে তিনি বলেন, দেশের কৃষি খাতকে সুরক্ষা দেওয়াই এ সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

তবে সেই আশ্বাস কার্যকর না হওয়ায় কারখানাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত থাকায় সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, গ্যাস সংকটের কারণে দৈনিক প্রায় ৫ কোটি টাকার সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে কারখানাটি আবার চালু হবে বলে কর্মকর্তারা আশা করছেন।

কারখানাটির উৎপাদন বন্ধের প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আশুগঞ্জ থেকে আশপাশের সাতটি জেলায় প্রিল্ড বা ক্ষুদ্র দানাদার ইউরিয়া সার সরবরাহ করা হয়। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় আঞ্চলিক সার সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। দেশীয় উৎপাদন কমে গেলে কৃষকদের চাহিদা পূরণে আমদানির প্রয়োজন বাড়ে, যার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও জড়িত।

কারখানার কারিগরি বিভাগের সূত্র জানায়, গত জুনে উৎপাদন শুরুর যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। তবে কর্মকর্তারা এখনো কারখানাটি চালুর বিষয়ে আশাবাদী। তাঁদের ধারণা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যে আশুগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। পাশাপাশি কম গ্যাস ব্যবহার করে সার উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়েও একটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) আশুগঞ্জ কারখানার উৎপাদন পুনরায় চালুর পাশাপাশি দেশের সার উৎপাদনব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েও কাজ করছে। নতুন একটি সার কারখানা স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিয়া জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আশুগঞ্জ কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরু করা সম্ভব হতে পারে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কারখানাটি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দেশের সার কারখানাগুলো চালু রাখতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বছরে প্রায় ২৬ থেকে ২৭ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানি করে। দেশের সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে সার রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে। সব সার কারখানা পুনরায় চালু করে ইউরিয়া আমদানির পেছনে ব্যয় হওয়া প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

এএফসিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে কারখানাটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। একসময় দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫০ টনে। গ্যাস সংকটের কারণে গত বছরের ১ মার্চ থেকে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে গ্যাস সরবরাহে বারবার বিঘ্ন ঘটায় কারখানাটিতে উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা সম্ভব হয়নি। এতে বিসিআইসির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বল্প সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ চালু হলে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু সরবরাহ আবার বন্ধ হয়ে গেলে সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকা যন্ত্রপাতিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় মেরামতের প্রয়োজনও বাড়ে। ফলে কারখানাটি উৎপাদনের উপযোগী করে তোলার প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আশুগঞ্জ সার কারখানা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু কাওসার বলেন, কারখানাটিতে সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এটি লাভজনকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। তাঁর মতে, কৃষি খাতে সরাসরি অবদান রাখা এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে রক্ষায় সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

আবু কাওসার আরও বলেন, শুধু গ্যাস সরবরাহ চালু করলেই হবে না, উৎপাদনের ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে হবে। বারবার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে যন্ত্রপাতি সচল রাখা, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং কারখানার আর্থিক কার্যকারিতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আশুগঞ্জের মতো সক্ষম একটি কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় দেশে সার উৎপাদন বাড়ানো ও আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে আশুগঞ্জে গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চালন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ বাপ্পী শাহরিয়ার জানান, কারখানাটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পেলেই তাঁরা গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু করতে প্রস্তুত।

দেশে বর্তমানে আটটি সার কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত। এসব কারখানার ছয়টিতে ইউরিয়া এবং দুটিতে নন-ইউরিয়া সার উৎপাদন করা হয়। তবে গ্যাস সংকট ও কাঁচামালের অভাবে এসব কারখানার উৎপাদন প্রায়ই ব্যাহত হয়; কোনো কোনো কারখানা সাময়িকভাবে চালু হলেও পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়।

আশুগঞ্জের দীর্ঘ অচলাবস্থা দেশের সারশিল্পের একটি বড় সমস্যাকে সামনে এনেছে। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দেশীয় কারখানাগুলো থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া কঠিন। তাই আশুগঞ্জ কারখানা পুনরায় চালু করার পাশাপাশি নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকার পাশাপাশি ইউরিয়া আমদানির ব্যয়ও দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।