পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি পরিবহনের ওপর নজর রাখা চারজন সামুদ্রিক নিরাপত্তা কর্মকর্তার মতে, মার্কিন অবরোধের মধ্যেও ইরান থেকে কিছু পেট্রোলিয়াম পণ্য বাইরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব চালানের প্রকৃত পরিমাণ, পরিবহনের সম্পূর্ণ পথ এবং অবরোধ এড়িয়ে যাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মার্কিন থিঙ্কট্যাংক ইউনাইটেড এগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান (ইউএএনআই) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিনম্যাক্সের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে অন্তত আটটি গ্যাসবাহী ট্যাংকার এবং একটি জেট জ্বালানিবাহী জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছেছে। এসব জাহাজের মধ্যে ছয়টি ট্যাংকার যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। মিয়ানমারে পৌঁছানো জেট জ্বালানিবাহী জাহাজটিও ওই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউএএনআইয়ের জেমিমা শেলি জানিয়েছেন, ওমানের শিনাস ও সোহারের উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় এলপিজিবাহী ট্যাংকার থেকে পণ্য স্থানান্তর করা হয়েছিল। পরে এসব চালানের বড় অংশ মালয়েশিয়ার জলসীমা হয়ে চীনে পাঠানো হয়েছে বলে তাঁর দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এসব এলপিজি চালানের মোট পরিমাণ আনুমানিক ৪১ লাখ ব্যারেল।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর একটি প্রচলিত পদ্ধতি। এর মাধ্যমে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে জ্বালানি নেওয়া যায়, ফলে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সরাসরি বন্দরে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কোনো দেশের পণ্য পরিবহনে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে জ্বালানির প্রকৃত উৎস, মালিকানা ও চূড়ান্ত গন্তব্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে একাধিক জাহাজ ও বিভিন্ন দেশের জলসীমা ব্যবহার করা হলে নজরদারির কাজ আরও জটিল হয়।
তবে ইরানের জ্বালানি পরিবহনের বিষয়ে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) অবরোধ এড়িয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, অবরোধ কার্যকর থাকার গত তিন মাসে মার্কিন বাহিনী ১৩৫টি জাহাজকে পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে এবং চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ অকেজো করে দিয়েছে।
মার্কিন রাজস্ব বিভাগও জানিয়েছে, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে তাদের নিষেধাজ্ঞা ও বর্জন অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ওয়াশিংটনের এই নীতির মূল লক্ষ্য ইরানের জ্বালানি খাত থেকে আয় সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশটির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা।
এ পরিস্থিতিতে চীনে জ্বালানি পৌঁছানোর যে দাবি করা হয়েছে, তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। চীন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের একটি বড় অংশীদার। ফলে ইরানের পণ্য সেখানে পৌঁছানোর তথ্য সঠিক হলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট চালানগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য ও বাণিজ্যিক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
সামগ্রিকভাবে, ইরানের জ্বালানি রপ্তানি নিয়ে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর বক্তব্যের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। একদিকে ইউএএনআই ও সিনম্যাক্সের তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকটি চালান গন্তব্যে পৌঁছানোর দাবি করা হয়েছে, অন্যদিকে সেন্টকম অবরোধ এড়িয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি নাকচ করেছে। তাই অবরোধের কার্যকারিতা এবং ইরানের প্রকৃত রপ্তানি পরিস্থিতি নির্ধারণে আরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।









