কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় দগ্ধ পাঁচজনসহ মোট ছয়জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য একজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রাজধানী ঢাকার চারজন এবং চুয়াডাঙ্গার দুজন রয়েছেন। বাকি চারজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। উদ্ধার অভিযান ও তথ্য যাচাইয়ের সময় হতাহতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় কাঠের তৈরি রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজ শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় সকাল ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে রিসোর্টটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
নিহত ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে যাঁদের পরিচয় জানা গেছে, তাঁরা হলেন রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ।
বাকি চারজনের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছিল। তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করছে। নিহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, ঘটনাস্থল থেকে প্রথমে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ১০ জনে পৌঁছায়।
দগ্ধ পাঁচজন হাসপাতালে ভর্তি
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনের পরিচয় জানা গেছে। তাঁরা হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) মাহমুদ সোহেল জানান, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্য একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
দগ্ধ ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক।
রিসোর্টে ছিলেন ১৬ পর্যটক
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে মোট নয়টি কক্ষ ছিল। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে তিনটি কক্ষের পর্যটকেরা চেকআউট করে চলে যান। বাকি ছয়টি কক্ষে অবস্থান করছিলেন ১৬ জন পর্যটক। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন শনিবার সকালে বিভিন্ন কাজে রিসোর্টের বাইরে ছিলেন।
সকালে আগুন লাগার পরপরই ভেতরে থাকা পর্যটকদের উদ্ধারে তৎপরতা শুরু হয়। কাঠের তৈরি ভবনে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। রিসোর্টে অবস্থানরত প্রত্যেক পর্যটকের অবস্থান নিশ্চিত করা এবং হতাহতের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি হয়ে ওঠে।
এ ধরনের ঘটনায় ভবনে অবস্থানরত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা, আগুন লাগার সময় কে কোথায় ছিলেন এবং কতজন নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি এসব তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে হতাহতের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
আগুনের কারণ খতিয়ে দেখছে পুলিশ
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
প্রাথমিকভাবে আগুন কীভাবে ছড়িয়েছে, বৈদ্যুতিক সংযোগে কোনো ত্রুটি ছিল কি না এবং রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা কেমন ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে তদন্তের ফল প্রকাশের আগে আগুন লাগার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
পর্যটনকেন্দ্রের আবাসিক স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কাঠের তৈরি ভবনে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকায় কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং জরুরি বহির্গমনপথ থাকা প্রয়োজন।
ইনানীর এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু এবং ছয়জনের আহত হওয়ার ঘটনায় পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে আগুনের প্রকৃত কারণ, প্রাণহানির পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য দায় নির্ধারণ করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।









