দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করেছেন সাব্বির রহমান। মিরপুরে জাতীয় ক্রিকেট লিগে (এনসিএল) খুলনার বিপক্ষে রাজশাহী বিভাগের হয়ে ২২১ বলে ১১৩ রানের ইনিংস খেলেছেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। তাঁর ব্যাটিং দৃঢ়তায় প্রথম ইনিংসে মাত্র ১১৯ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পরও ম্যাচ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে রাজশাহী। দীর্ঘ বিরতির পর তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছানো এই ইনিংস সাব্বিরের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় দলে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়েও নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
ক্যারিয়ারের ৮৪তম প্রথম শ্রেণির ম্যাচে এসে পঞ্চম সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন সাব্বির। এর আগে ২০১৮ সালের জুনে চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষে ১৬৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আর শতকের দেখা পাননি। অবশেষে মিরপুরের মাঠে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল।
বিপর্যয় সামলে রাজশাহীকে বাঁচালেন সাব্বির
খুলনার বিপক্ষে ম্যাচের শুরুটা রাজশাহীর জন্য ছিল হতাশাজনক। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১১৯ রানে অলআউট হয়ে বড় চাপে পড়ে দলটি। প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচে টিকে থাকতে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটারদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা জরুরি হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে রাজশাহী। শেষ দিনে ৩ উইকেটে ৩০০ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করে দলটি। অধিনায়ক প্রিতম কুমার ও সাব্বির রহমান ইনিংস এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রিতম ৪৪ রান করে ফিরে গেলেও সাব্বির এক প্রান্তে দৃঢ়তা ধরে রাখেন। পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিং করে দলের সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি উইকেট ধরে রাখার চেষ্টা করেন তিনি।
সাব্বিরের ১১৩ রানের ইনিংসটি সাজানো ছিল আটটি চার ও একটি ছক্কায়। তাঁর ব্যাটিংয়ে রাজশাহীর ইনিংস এগিয়ে যায়। দলীয় ৪৭৪ রানে নবম ব্যাটার হিসেবে আউট হন তিনি। এরপরও ইনিংস চালিয়ে যায় রাজশাহী। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ৫০০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা না করেই ড্র মেনে নেয় দলটি।
প্রথম ইনিংসে মাত্র ১১৯ রানে অলআউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৫০০ রান পর্যন্ত পৌঁছানো রাজশাহীর ঘুরে দাঁড়ানোর বড় উদাহরণ। সাব্বিরের সেঞ্চুরি এখানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর ইনিংস শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলক নয়, দলের পরাজয়ের শঙ্কা কাটিয়ে ম্যাচ বাঁচানোর ক্ষেত্রেও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় দলে ফেরার পথ কতটা সহজ?
একসময় বাংলাদেশের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে পরিচিত মুখ ছিলেন সাব্বির রহমান। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত এই ক্রিকেটার জাতীয় দলের হয়ে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জায়গা ধরে রাখতে নিয়মিত পারফরম্যান্সের বিকল্প নেই।
দীর্ঘ বিরতির পর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরি নিঃসন্দেহে তাঁর জন্য ইতিবাচক ঘটনা। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নির্বাচকদের নজরে আসার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু একটি শতকই জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করে না। সাম্প্রতিক ফর্ম, ধারাবাহিক রান, ফিটনেস, দলের প্রয়োজন এবং নির্বাচকদের পরিকল্পনা—সবকিছুই বিবেচনায় আসবে।
সাব্বিরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ইনিংসের সাফল্য ধরে রাখা। পরবর্তী ম্যাচগুলোতেও নিয়মিত রান করতে পারলে জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে। আপাতত আট বছরের অপেক্ষা শেষে সেঞ্চুরি করে নিজের ব্যাটিং সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন তিনি।
চট্টগ্রামের দাপুটে জয়, বরিশালের টানা দুই হার
এদিকে কক্সবাজারে বরিশাল বিভাগের বিপক্ষে বড় জয় পেয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। প্রথম ইনিংসে ৫৭৬ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে দলটি। জবাবে বরিশাল প্রথম ইনিংসে ২৮২ রানে অলআউট হলে ফলোঅনে পড়ে।
শেষ দিনে দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৪৯ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করে বরিশাল। রাফসান আল মাহমুদ ও মঈনুল ইসলাম শুরুতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের ব্যাটিংয়ে ম্যাচ বাঁচানোর আশা জাগে। মধ্যাহ্ন বিরতিতে বরিশালের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ২২৬ রান।
তবে বিরতির পর আর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি দলটি। রাফসান ৭২ রান করে এবং মঈনুল ৪১ রান করে আউট হলে বরিশালের ব্যাটিংয়ে ধস নামে। দ্রুত উইকেট হারিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯৩ রানে অলআউট হয় তারা। ফলে ইনিংস ও ১ রানের ব্যবধানে জয় পায় চট্টগ্রাম।
বল হাতে চট্টগ্রামের বাঁহাতি স্পিনার আশরাফুল হাসান রোহান ছিলেন দুর্দান্ত। ৭৭ রান দিয়ে পাঁচটি উইকেট নেন তিনি। আরেক বাঁহাতি স্পিনার হাসান মুরাদ দুটি উইকেট শিকারের পাশাপাশি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন।
চলতি মৌসুমে এটি চট্টগ্রামের প্রথম জয়। দুই ম্যাচ শেষে দলটির সংগ্রহ ১১ পয়েন্ট, সঙ্গে রয়েছে বোনাস পয়েন্ট। বিপরীতে টানা দুই ম্যাচে হেরে এখনো পয়েন্টের খাতা খুলতে পারেনি বরিশাল।
জাতীয় ক্রিকেট লিগের এই ম্যাচগুলোতে ব্যক্তিগত সাফল্য ও দলীয় লড়াই—দুই দিকই সামনে এসেছে। সাব্বিরের সেঞ্চুরি যেমন তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনার নতুন উপলক্ষ তৈরি করেছে, তেমনি চট্টগ্রামের জয় ও হাসান মুরাদের ২০০ উইকেটের মাইলফলক ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁদের পারফরম্যান্সের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। সাব্বিরের জন্য এখন ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।









