সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাচের দৃশ্য, ক্ষণস্থায়ী ট্রেন্ড আর ভাইরাল হওয়ার নানা কৌশলের ভিড়ে হঠাৎ ভেসে আসে এক পরিচিত কণ্ঠ। চোখ বন্ধ, মাথা সামান্য কাত, একটি হাত ওপরে তোলা—মনে হয়, শিল্পী যেন নিজের সুরের জগতে ডুবে আছেন। তাঁর কণ্ঠে এমন এক আবেগ, যা মুহূর্তের মধ্যে থামিয়ে দিতে পারে অবিরাম স্ক্রল করতে থাকা শ্রোতাকে। তিনি উস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান। আর নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর সংগীত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে ‘আফরিন আফরিন’।
একসময় যে শিল্পীকে জানতে হলে কাওয়ালির আসরে যেতে হতো, সংগীতের অ্যালবাম সংগ্রহ করতে হতো কিংবা অভিজ্ঞ শ্রোতার পরামর্শ নিতে হতো, এখন তাঁকে আবিষ্কার করা যাচ্ছে স্মার্টফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দেখেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কখনো গানের একটি অংশ সামনে আনছে, কখনো দেখাচ্ছে তাঁর আবেগময় পরিবেশনা। সেই ছোট্ট পরিচয় থেকেই অনেক তরুণ খুঁজে নিচ্ছেন পুরো গান, জানতে চাইছেন শিল্পীর নাম ও সংগীতজীবনের ইতিহাস।
তবে নুসরাতের জনপ্রিয়তার ব্যাখ্যা কেবল প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যালগরিদম তাঁর সংগীতের আবেদন তৈরি করেনি; বরং আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত সেই আবেদনকে নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। কয়েক দশক আগে যে কণ্ঠ অসংখ্য মানুষকে মুগ্ধ করেছিল, আজও তা ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রজন্মের ব্যবধান পেরিয়ে শ্রোতার মনে জায়গা করে নিতে পারছে।
কাওয়ালির ঐতিহ্য থেকে বিশ্বসংগীতের পরিসরে
১৯৪৮ সালের ১৩ অক্টোবর জন্ম নেওয়া নুসরাত ফতেহ আলী খান ছিলেন কাওয়ালি সংগীতের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী। সুফি আধ্যাত্মিকতা ও ভক্তিমূলক সংগীতের সঙ্গে সম্পর্কিত কাওয়ালিকে তিনি নিজস্ব কণ্ঠশৈলী, অসাধারণ সুরবিন্যাস এবং আবেগের গভীরতা দিয়ে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। পারিবারিক সংগীত-ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করলেও তাঁর পরিচিতি কেবল সেই ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছেও তিনি হয়ে ওঠেন দক্ষিণ এশীয় সংগীতের এক স্বতন্ত্র প্রতিনিধি।
নুসরাতের পরিবেশনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আবেগের ধাপে ধাপে বিস্তার। অনেক সময় তাঁর গান শুরু হতো শান্ত ও সংযত সুরে। এরপর ধীরে ধীরে ছন্দের গতি বাড়ত, কণ্ঠে যুক্ত হতো নতুন অলংকরণ, আর সুরের পুনরাবৃত্তি শ্রোতাকে নিয়ে যেত আরও গভীর আবেগের দিকে। কখনো তাঁর দীর্ঘ সুরপ্রক্ষেপণ, কখনো দ্রুত স্বরবিন্যাস, আবার কখনো একই পঙ্ক্তির ভিন্ন ভিন্ন আবেগময় উপস্থাপন পুরো পরিবেশনাকে অনন্য করে তুলত।
এই সংগীত উপভোগ করতে উর্দু ভাষা জানা কিংবা সুফি দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। গানের শব্দের অর্থ না বুঝলেও শ্রোতা তাঁর কণ্ঠে অনুভব করতে পারেন আকুলতা, বিরহ, আত্মসমর্পণ, আনন্দ কিংবা গভীর বেদনা। সংগীতের এই ক্ষমতাই নুসরাতকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করে তুলেছে।
তাঁর কণ্ঠে আবেগ প্রকাশের ধরন ছিল স্বতন্ত্র। কোথাও তা কোমল ও অন্তর্মুখী, কোথাও প্রবল ও উচ্ছ্বসিত। এই দুই মেরুর মধ্যে স্বাভাবিক যাতায়াত তাঁর সংগীতকে একই সঙ্গে অন্তরঙ্গ ও বিস্তৃত করে তুলেছিল। শ্রোতা চাইলে সেখানে প্রেমের অনুভূতি খুঁজে নিতে পারেন, আবার আধ্যাত্মিক প্রশান্তি কিংবা জীবনের গভীর কোনো আকুলতার সঙ্গেও মিল খুঁজে পেতে পারেন।
‘আফরিন আফরিন’: প্রেম ও মুগ্ধতার অনন্য প্রকাশ
নুসরাতের সংগীতের আবেদন বোঝার জন্য ‘আফরিন আফরিন’ একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘সঙ্গম’ অ্যালবামের এই গানটি সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে আজও শ্রোতাদের আকর্ষণ করে। গানটির কথা লিখেছেন জাভেদ আখতার। নুসরাতের কণ্ঠ, গীতিকবিতার সৌন্দর্য এবং আধুনিক সংগীতায়োজনের সমন্বয় গানটিকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
‘আফরিন’ শব্দটি প্রশংসা ও মুগ্ধতার প্রকাশ। গানটিতে প্রিয় মানুষের সৌন্দর্য এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেন সাধারণ শব্দে তার যথার্থ বর্ণনা দেওয়া কঠিন। তাই বারবার ফিরে আসে বিস্ময় ও প্রশংসার সেই উচ্চারণ। প্রতিবার পুনরাবৃত্তির সঙ্গে অনুভূতিটি আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে, আর শ্রোতার মনে তৈরি হয় এক ধরনের আবেগময় অনুরণন।
জাভেদ আখতারের গীতিকবিতায় উর্দু রোমান্টিক কবিতার ঐতিহ্য লক্ষ করা যায়। এই কাব্যধারায় প্রিয় মানুষের একটি দৃষ্টি, হাসি কিংবা উপস্থিতিও গভীর তাৎপর্য বহন করতে পারে। ব্যক্তিগত প্রেম কখনো এমন উচ্চতায় পৌঁছায়, যেখানে সৌন্দর্য কেবল চোখে দেখার বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিস্ময় ও মুগ্ধতার অভিজ্ঞতা। ‘আফরিন আফরিন’-এ সেই অনুভূতিই সংগীতের ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।
গানটির কথাকে জীবন্ত করে তুলেছে নুসরাতের কণ্ঠ। তিনি আবেগ প্রকাশে কখনো সংযত, কখনো উচ্ছ্বসিত। সুরের ওঠানামা এবং কণ্ঠের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তার প্রেমের অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। তাঁর পরিবেশনায় আবেগ রয়েছে, কিন্তু তা অকারণ অতিরঞ্জনে পর্যবসিত হয় না। বরং মুগ্ধতা, আকুলতা ও সুরের স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে।
সংগীতায়োজনও এই ভারসাম্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। ছন্দ গানের প্রবাহকে সচল রাখে, কিন্তু কণ্ঠের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে না। ফলে শ্রোতার মনোযোগ বারবার ফিরে আসে গানের মূল সুর ও কথায়। গান শেষ হয়ে গেলেও এর প্রধান সুর সহজে মন থেকে মুছে যায় না।
‘আফরিন আফরিন’-এর দীর্ঘস্থায়ী আবেদন এখানেই। গানটি সহজে মনে রাখার মতো, কিন্তু এর সংগীতগত সৌন্দর্য কেবল সহজ সুরে সীমাবদ্ধ নয়। কণ্ঠের কারুকাজ, গীতিকবিতার গভীরতা এবং সংযত সংগীতায়োজন একে সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করার শক্তি দিয়েছে।
ভাইরাল হওয়ার যুগে কেন প্রাসঙ্গিক নুসরাত
ডিজিটাল দুনিয়ায় জনপ্রিয়তার চেহারা দ্রুত বদলে যায়। কোনো গান বা ভিডিও অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, আবার নতুন কোনো প্রবণতা সামনে এলে সেটি হারিয়েও যেতে পারে। ছোট ভিডিও, আকর্ষণীয় দৃশ্য এবং গানের কয়েক সেকেন্ডের অংশ এখন সংগীত আবিষ্কারের পরিচিত মাধ্যম। কিন্তু একটি গান দীর্ঘদিন মানুষের মনে টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করে এর অন্তর্নিহিত আবেদন ও শ্রোতার সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্কের ওপরও।
নুসরাতের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই পরিচয়ের সুযোগ বাড়িয়েছে। যাঁরা তাঁর জীবদ্দশায় জন্মাননি, তাঁরাও এখন সহজেই তাঁর পরিবেশনা দেখতে ও শুনতে পারছেন। তাঁদের কাছে শিল্পীকে জানার প্রথম সূত্র হতে পারে একটি ভাইরাল ভিডিও। কিন্তু সেখানেই অভিজ্ঞতা শেষ হয় না। অনেকেই পরে পুরো গান শোনেন, তাঁর অন্য পরিবেশনা খুঁজে দেখেন এবং কাওয়ালি সম্পর্কে জানার আগ্রহ অনুভব করেন।
পুরোনো ও নতুন শ্রোতার কাছে নুসরাতের আবেদন অবশ্য এক রকম নয়। যাঁরা তাঁর গান শুনে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে কণ্ঠটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক পরিবেশ কিংবা জীবনের বিশেষ কোনো সময়ের অনুভূতি। নতুন শ্রোতাদের সেই স্মৃতি নেই। তাঁরা কোনো পূর্বপরিচিত আবেগের ওপর নির্ভর না করেই তাঁর সংগীতের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। তবু দুই প্রজন্মের মানুষই তাঁর কণ্ঠে এমন কিছু খুঁজে পাচ্ছেন, যা তাঁদের মনোযোগ ধরে রাখে।
এখানেই একজন বড় শিল্পীর স্থায়িত্বের পরিচয়। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলায়, শ্রোতার অভ্যাস বদলায়, সংগীত প্রচারের মাধ্যমও পাল্টে যায়। কিন্তু শক্তিশালী শিল্পকর্ম নতুন পরিবেশে নতুন শ্রোতার কাছে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। নুসরাতের সংগীত সেই সামর্থ্যেরই পরিচয় দিচ্ছে।
‘আফরিন আফরিন’ তাই কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো গান নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তি কোনো শিল্পীকে নতুন করে পরিচিত করতে পারে, কিন্তু তাঁর শিল্পের গভীরতা তৈরি করতে পারে না। অ্যালগরিদম শ্রোতাকে গানের কাছে নিয়ে আসে; এরপর তাঁকে আটকে রাখে কণ্ঠ, সুর ও আবেগ।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের সংগীতের জাদু ঠিক এই জায়গাতেই। নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁকে প্রথম চিনছে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও থেকে। কিন্তু সেই সামান্য পরিচয় দীর্ঘ শ্রবণ-অভিজ্ঞতায় পরিণত হওয়ার পেছনে রয়েছে তাঁর নিজস্ব শিল্পশক্তি। অ্যালগরিদম ‘আফরিন আফরিন’কে আবার সামনে এনেছে, কিন্তু গানটির মুগ্ধতা কিংবা নুসরাতের কণ্ঠের আবেদন নতুন নয়। তাঁর সংগীত বহু আগেই সময়ের সীমা অতিক্রম করেছে; ডিজিটাল দুনিয়া এখন সেই সত্যটিই নতুন করে তুলে ধরছে।









