,

আয়াসের জামিন শুনানিতে আদালতে আইনজীবীদের হাতাহাতি

ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার আল-নূর মোহাম্মদ আয়াসসহ দুই আসামির জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। বুধবার বিকেলে বিচারকের সামনেই দুই পক্ষের আইনজীবীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে দেখে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান। পরে আইনজীবীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলে তিনি আবার এজলাসে ফিরে আসেন এবং আয়াস ও মারজিয়া খন্দকারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আদালতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনার সূত্রপাত হয় আসামিদের জামিন ও কারাগারে আটক রাখার আবেদন নিয়ে শুনানির সময়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্যের একপর্যায়ে আসামিপক্ষের একজন আইনজীবী উচ্চ স্বরে প্রতিবাদ জানান। এরপরই দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়, যা দ্রুত হাতাহাতিতে রূপ নেয়। এ ঘটনায় আসামিপক্ষের আইনজীবী আল মহসিন তৌহিদের শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যায়।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটের দিকে। পরিস্থিতি শান্ত করতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী মনির হোসাইন এগিয়ে আসেন। তাঁদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে বিকেল ৪টা ৪২ মিনিটে বিচারক আবার এজলাসে বসেন। এরপর শুনানি শেষে দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার

গত ১০ অক্টোবর রাজধানীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় আল-নূর মোহাম্মদ আয়াসসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আয়াস রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব। এ ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা করা হয়।

মামলার পরদিন আদালত চার আসামির মধ্যে আয়াসসহ দুজনের তিন দিন করে এবং অন্য দুজনের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বুধবার আয়াস ও মারজিয়া খন্দকারকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক আব্দুল গাফফার হিমেল তাঁদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত পলাতক অন্য আসামিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা এবং আসামিদের নাম-ঠিকানা যাচাইয়ের স্বার্থে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কারাগারে রাখা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আসামিপক্ষের জামিন আবেদন ও যুক্তি

শুনানিতে আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মনির হোসাইন জামিনের আবেদন করেন। তিনি আদালতকে বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো সঠিক নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আয়াস অসুস্থ এবং মারজিয়ার একটি সন্তান রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের জামিন দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।

মনির হোসাইন আরও দাবি করেন, আসামিদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল ভারতের আগ্রাসনের বিরোধিতা। দেয়ালে ভারতীয় শিল্পীদের ছবি থাকায় তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বলে তিনি আদালতে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আসামিরা দেশের শিল্পীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

আসামিপক্ষের এই বক্তব্যের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি আদালতে বলেন, প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়ার মতো আচরণ ঔদ্ধত্যপূর্ণ। তাঁর প্রশ্ন ছিল, এ ঘটনার সঙ্গে পাকিস্তান বা জিন্নাহর প্রসঙ্গ কেন আসবে এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখেই কেন কালি দেওয়া হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী আরও অভিযোগ করেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে উসকে দেওয়া এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা। তিনি আসামিদের বক্তব্য ও আচরণ নিয়ে আপত্তি জানান এবং তাঁদের বিরুদ্ধে জনসমক্ষে গালাগাল ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি আসামিপক্ষের আইনজীবীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও মন্তব্য করেন।

বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা, এরপর হাতাহাতি

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য চলাকালে আসামিপক্ষের একজন আইনজীবী উচ্চ স্বরে প্রতিবাদ জানান। এরপর আদালতকক্ষেই দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। একপর্যায়ে তাঁরা বিচারকের সামনেই হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবীর সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় আসামিপক্ষের আইনজীবী আল মহসিন তৌহিদের শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যায়।

আদালতের মতো বিচারিক পরিবেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় শুনানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি দেখে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান। পরে দুই পক্ষের আইনজীবীরা পরিস্থিতি শান্ত করেন। বিকেল ৪টা ৪২ মিনিটে বিচারক এজলাসে ফিরে আসেন এবং আয়াস ও মারজিয়া খন্দকারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

ঘটনাটি আদালতকক্ষে আইনজীবীদের পেশাগত আচরণ ও বিচারিক কার্যক্রমের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কোনো মামলার অভিযোগ, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা জামিনের আবেদন নিয়ে মতবিরোধ থাকলে তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত আইনি যুক্তি ও আদালতের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। বিচারকের উপস্থিতিতে আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতি বিচারিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করে এবং আদালতের শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে।

এ ঘটনায় দুই আসামির জামিন আবেদন মঞ্জুর হয়নি; তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অন্য আসামিদের বিষয়ে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারিত হবে। আদালতে উত্থাপিত অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।