,

এলপিজির বাজারে অস্থিরতা, ১২ কেজির সিলিন্ডার ২,৫০০ টাকা

সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য কোথাও ২ হাজার টাকা, আবার কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে বলে ভোক্তারা জানিয়েছেন। অনেক এলাকায় বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করেছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ২ সেপ্টেম্বর থেকে এ দাম কার্যকর হয়, যা আগস্টের নির্ধারিত ১ হাজার ৫৯৮ টাকার তুলনায় ১৩ টাকা কম। নির্ধারিত দামের মধ্যে ভ্যাটও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কিন্তু বাস্তব বাজারচিত্র একেবারেই ভিন্ন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বিইআরসির নির্ধারিত দামের তুলনায় ভোক্তাকে অতিরিক্ত ৪১৫ থেকে ৯১৫ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। কিছু এলাকায় আবার বাড়তি দামেও সিলিন্ডার মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভোক্তাদের অভিযোগ, সরবরাহ সংকটের কথা বলে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। কারও কারও দাবি, বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য না থাকার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি সরাসরি বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোট খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁসহ এলপিজিনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোও একই চাপে পড়েছে।

তবে খুচরা বিক্রেতাদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, পরিবেশক ও ডিলার পর্যায়েই বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে। ফলে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে তাদের লোকসান হচ্ছে। অর্থাৎ বাজারে যে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার দায় খুচরা বিক্রেতারা সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপাচ্ছেন।

এদিকে এলপিজি সরবরাহ নিয়ে সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে বাজারের অভিজ্ঞতার একটি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে আমদানিকারক ও অপারেটররা জানিয়েছিলেন, দেশে এলপিজির সামগ্রিক মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি সন্তোষজনক এবং জাতীয় পর্যায়ে কোনো ঘাটতি নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে আরও ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন।

তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের একাংশ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থার অস্থিরতা বাংলাদেশের বাজারেও প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাধা, জাহাজের সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন কার্গো সংগ্রহের খরচ বেড়েছে বলে কয়েকজন আমদানিকারক ও শিল্প প্রতিনিধি জানিয়েছেন। সেপ্টেম্বরের আমদানির পরিমাণ আগস্টের তুলনায় কমে যাওয়ার কথাও বিভিন্ন শিল্পসূত্র জানিয়েছে।

এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন উপাদান বিবেচনায় নেয় বিইআরসি। সেপ্টেম্বরের দাম নির্ধারণের সময় সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস, পরিবহন ব্যয়, ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম এবং বিনিময় হারসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো হিসাব করা হয়েছিল। ওই মাসে প্রোপেনের দাম প্রতি টন ৬২৫ ডলার এবং বিউটেনের দাম ৬৬০ ডলার নির্ধারিত ছিল। ৩৫ শতাংশ প্রোপেন ও ৬৫ শতাংশ বিউটেনের মিশ্রণ ধরে গড় সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস দাঁড়ায় ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার প্রতি টন।

বাংলাদেশের এলপিজি বাজারে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত বড়। দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। আমদানি করা এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশই বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত হয়। ফলে সরবরাহব্যবস্থায় সামান্য অস্থিরতাও সরাসরি সাধারণ মানুষের রান্নার খরচে প্রভাব ফেলে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৩০ সেপ্টেম্বর সরকার জেলা প্রশাসনগুলোকে এলপিজির কৃত্রিম সংকট এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জেলা প্রশাসকদের বলেছেন, কোথাও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কেন সংকটের অভিযোগ উঠছে এবং কেন ভোক্তাদের কাছ থেকে বিইআরসি নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া হচ্ছে, তা তথ্য-প্রমাণসহ খতিয়ে দেখতে হবে।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, কোথাও প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতি পাওয়া গেলে সরবরাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজি মজুত রাখা কিংবা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি আমদানি ও মজুত থাকার পরও খুচরা বাজারে কেন ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় উঠছে। জেলা প্রশাসনের তদন্ত এবং আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের পরবর্তী আলোচনায় এই মূল্যবৈষম্যের প্রকৃত কারণ আরও পরিষ্কার হতে পারে। এদিকে বিইআরসি অক্টোবরের নতুন মূল্য নির্ধারণ করবে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি পরিস্থিতির পাশাপাশি খুচরা বাজারে এর প্রভাবও নজরে থাকবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।