ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে সহকারী পাইলটের হামলা এবং সেটিকে বিপজ্জনকভাবে নিচে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করা এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটটি মাঝআকাশে গুরুতর সংকটে পড়ে। পরে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে উড়োজাহাজটি। ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, বিমানের সব যাত্রী নিরাপদে রয়েছেন এবং ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা কাজ করছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হলে শুধু ইসরায়েল নয়, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারত। তিনি এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর দাবি, যাত্রী ও ক্রুদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত ‘ভালো মানুষেরাই জিতেছে’। তবে হামলার পেছনে কারও পরিকল্পিত ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
কী ঘটেছিল বিমানের ভেতরে
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি যখন আকাশে ছিল, তখন সহকারী পাইলট প্রধান পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর বিমানের নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা হয় এবং উড়োজাহাজটি অস্বাভাবিক দ্রুততায় নিচে নামতে শুরু করে।
প্রায় ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট নিচে নেমে যায় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে যাত্রী ও ক্রুদের কয়েকজন ককপিটের দিকে এগিয়ে যান। আহত প্রধান পাইলট ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হলে তারা ভেতরে ঢুকে সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।
বিমানে থাকা আরও দুজন ফ্লাইদুবাই পাইলটের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়। পরে সেটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। ফ্লাইদুবাইয়ের প্রাথমিক বিবৃতিতেও নিশ্চিত করা হয়েছে যে বিমানটি নিরাপদে তাবুকে অবতরণ করেছে এবং যাত্রীরা নিরাপদ রয়েছেন।
ইরানের সম্পৃক্ততা আছে কি?
ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এর পেছনে কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনের পরিকল্পনা ছিল কি না। বিশেষ করে ইরানের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু বলেছেন, এই মুহূর্তে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তদন্তকারীরা হামলাকারীর ‘শিকড়’ পর্যন্ত যাওয়ার চেষ্টা করবেন। তাঁর কোনো সহযোগী ছিল কি না, কিংবা ঘটনার সঙ্গে ইরানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তদন্তের মাধ্যমেই তা বেরিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটক সহকারী পাইলটকে সৌদি আরবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, পরবর্তী পর্যায়ে তাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও নেওয়া হতে পারে, কারণ সেখান থেকেই তিনি ওই ফ্লাইটে উঠেছিলেন। তদন্তে ইসরায়েলও অংশ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আগাম কোনো সতর্কবার্তা ছিল না
নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজে হামলার আগে ইসরায়েলের কাছে এ ধরনের কোনো সতর্কবার্তা বা গোয়েন্দা তথ্য ছিল না। ফলে ঘটনাটি কীভাবে ঘটল এবং হামলাকারীর উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তদন্তে সহযোগিতার বিষয়ে আমিরাত সম্মতি দিয়েছে বলে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলও তদন্তে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এদিকে ইসরায়েল এরই মধ্যে ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তবে হামলাকারীর সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা তার পেছনে অন্য কারও নির্দেশনা ছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ফ্লাইদুবাইয়ের অবস্থান
ঘটনাটি নিয়ে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে ফ্লাইদুবাই। বিমান সংস্থাটির বক্তব্য, ফ্লাইট এফজেড ১০৭৩ দুবাই থেকে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রার সময় একটি ঘটনা ঘটে এবং পরে বিমানটি তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা তদন্তে সহযোগিতা করছে।
ঘটনার পেছনের কারণ এখনো নিশ্চিত নয়—এ কথাই জোর দিয়ে বলছে বিমান সংস্থাটি। ফলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে যে ধরনের হামলা হিসেবে দেখছে এবং তদন্তে যে সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে, সেগুলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ এখনো নেই।
তবে মাঝআকাশে প্রধান পাইলটের ওপর হামলা, অল্প সময়ের মধ্যে বিমানের বিপজ্জনক উচ্চতা হারানো এবং পরে যাত্রী-ক্রুদের হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঘটনার পূর্ণ কারণ, হামলাকারীর উদ্দেশ্য এবং কোনো সহযোগী বা বাইরের পক্ষ এতে জড়িত ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।









