রাজধানীর দিলকুশা থেকে আগারগাঁওয়ে প্রধান কার্যালয় সরানোর উদ্যোগ নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। প্রস্তাবিত নতুন কার্যালয়ে গেলে সংস্থাটির বার্ষিক অফিস পরিচালন ব্যয় ১ কোটি ৭৫ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬ টাকা বা ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়বে। তবে ফ্লোর ভাড়ার হিসাব করলে ব্যয়ের ব্যবধান আরও বড়—শুধু এ খাতেই বছরে অতিরিক্ত ২ কোটি ৬১ লাখ ২৩ হাজার ৪০ টাকা গুনতে হবে।
কার্যালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবের সঙ্গে নতুন একটি সিদ্ধান্তও সামনে এসেছে। আগারগাঁওয়ে প্রায় ৩২ হাজার বর্গফুট জায়গা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের অনাপত্তি চাওয়ার মাত্র দুই দিন পর ঢাকার সুবিধাজনক এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার বর্গফুট জায়গা খুঁজে বের করতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে আইডিআরএ। ফলে আগারগাঁওয়ের প্রস্তাবিত কার্যালয়ই শেষ পর্যন্ত নেওয়া হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
আইডিআরএর নথি অনুযায়ী, বর্তমানে দিলকুশার এসবিসি টাওয়ারে সংস্থাটির কার্যালয়ের আয়তন ২৯ হাজার ৮৭৬ বর্গফুট। প্রতি বর্গফুটে মাসে ৭৮ থেকে ৮০ টাকা ভাড়া হিসেবে বছরে মূল ফ্লোর ভাড়া দিতে হয় ৩ কোটি ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৯৬০ টাকা।
অন্যদিকে আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনের ১১, ১৫, ১৬ ও ১৭ তলা এবং নিচতলার একটি অংশ নিয়ে ৩১ হাজার ৯৮৯ বর্গফুট জায়গা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে প্রতি বর্গফুটের মাসিক ভাড়া ১৩০ টাকা। এ হিসাবে বছরে মূল ফ্লোর ভাড়া দাঁড়াবে ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ বর্তমান কার্যালয়ের তুলনায় নতুন কার্যালয়ে ফ্লোর ভাড়া বাবদ বছরে বাড়তি খরচ হবে ২ কোটি ৬১ লাখ ২৩ হাজার ৪০ টাকা। প্রতি বর্গফুটে মাসিক ভাড়ার ব্যবধান হবে ৫০ থেকে ৫২ টাকা।
তবে ফ্লোর ভাড়ার এই পুরো বাড়তি অর্থকে আইডিআরএর প্রকৃত অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় হিসেবে দেখলে হিসাবটি অসম্পূর্ণ হবে। কারণ নতুন ভবনের প্রস্তাবিত ভাড়ার মধ্যে কয়েকটি সেবার খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০টি গাড়ির পার্কিং, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণ এবং জেনারেটর সুবিধা।
বর্তমানে দিলকুশার কার্যালয়ে এসব সেবার জন্য আলাদাভাবে বছরে ৮৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৪৪ টাকা ব্যয় হয়। ফলে দুই জায়গার ব্যয় তুলনা করতে হলে ফ্লোর ভাড়ার পাশাপাশি এসব সেবার খরচও হিসাবের মধ্যে রাখতে হচ্ছে।
সব খরচ সমন্বয়ের পর আইডিআরএর বার্ষিক অফিস পরিচালন ব্যয় বর্তমানের ৫ কোটি ৯৫ লাখ ২ হাজার ৯০৪ টাকা থেকে বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬ টাকা, যা বর্তমান পরিচালন ব্যয়ের ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে অবশ্য বড় কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। দিলকুশা ও আগারগাঁও—দুই জায়গাতেই বছরে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে হিসাব করা হয়েছে।
ডিআর সেন্টার থাকবে দিলকুশাতেই
প্রধান কার্যালয় আগারগাঁওয়ে সরানো হলেও আইডিআরএর ডিজাস্টার রিকভারি বা ডিআর সেন্টার দিলকুশাতেই থাকবে। এসবিসি টাওয়ারের সপ্তম তলায় ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে রয়েছে এই সেন্টার। এর বার্ষিক ভাড়া ৩২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
নথিতে বলা হয়েছে, ডিআর সেন্টারে ভারী ও সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম রয়েছে। ফলে সেটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হতে পারে। তাই প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর হলেও এই অংশের ভাড়া অব্যাহত থাকবে।
ভাড়ার প্রস্তাব বদলেছে কয়েক দফায়
আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে সাধারণ বাণিজ্যিক ভাড়া প্রতি বর্গফুটে ২৫০ টাকা। তবে আইডিআরএর জন্য বিশেষ হারে ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে।
গত ১৮ আগস্ট আইডিবি ভবন পরিচালনাকারী ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক-বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি এডুকেশন ওয়াকফের জ্যেষ্ঠ প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী জাহিদ-আল-মাহাদী আইডিআরএ চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন। সেখানে ভ্যাট ছাড়া প্রতি বর্গফুটে ১৫১ টাকা ভাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এরপর ৭ সেপ্টেম্বর আইডিআরএর নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) মনিরা বেগম প্রতি বর্গফুটে ১১৮ টাকা ‘অল-ইন’ ভাড়ার পাল্টা প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে মূল ভাড়া ধরা হয় ৭৫ টাকা এবং ইউটিলিটি ও অন্যান্য সেবা বাবদ ৪৩ টাকা।
এই প্রস্তাবে ২০টি গাড়ির পার্কিং, জেনারেটর, নিরাপত্তা ও কেন্দ্রীয় এসি রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা রাখার কথা বলা হয়। পাশাপাশি তিন বছরের চুক্তি এবং পরবর্তী ১০ বছর ভাড়া অপরিবর্তিত রাখার শর্তও প্রস্তাব করা হয়েছিল।
পরে ১৭ সেপ্টেম্বর ওয়াকফের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেশমা সুলতানার সই করা চিঠিতে ভ্যাট ছাড়া প্রতি বর্গফুটে মাসিক ১৩০ টাকা ‘অল-ইন’ ভাড়ার চূড়ান্ত প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আইডিআরএর কার্যালয় স্থানান্তরের ব্যয়ের হিসাব এই প্রস্তাবকে ভিত্তি করে করা হয়েছে।
৫০ হাজার বর্গফুট জায়গা খুঁজতে নতুন কমিটি
কার্যালয় স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় সময়ের ব্যবধানও আলোচনায় এসেছে। ২০ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে আগারগাঁওয়ে কার্যালয় স্থানান্তরের জন্য অনাপত্তি চেয়ে চিঠি দেয় আইডিআরএ। এর দুই দিন পর, ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার সুবিধাজনক এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার বর্গফুট জায়গা শনাক্ত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
ফলে ৩১ হাজার ৯৮৯ বর্গফুটের আগারগাঁওয়ের প্রস্তাবিত জায়গার বাইরে আরও বড় পরিসরের কার্যালয় খোঁজার বিষয়টি সামনে এসেছে। আইডিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
২০১৪ সাল থেকে এসবিসি টাওয়ারে কার্যালয় পরিচালনা করছে আইডিআরএ। সংস্থাটির নথিতে বর্তমান ভবনে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ঘাটতি এবং সংস্কারের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান জায়গা পুরোপুরি ব্যবহার করা না যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলক ছোট পরিসরে কাজ করতে হচ্ছে বলেও আইডিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে নতুন ভবনে গেলে অফিসের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস নতুন করে করতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসার জায়গা, কেবিন, সভাকক্ষ, নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামো তৈরিতে এককালীন সংস্কার ব্যয় হবে। এই ব্যয় এখন পর্যন্ত বার্ষিক পরিচালন ব্যয়ের হিসাবে ধরা হয়নি।
বাড়তি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
কার্যালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে একটি বীমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, আইডিআরএর পরিচালন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পরোক্ষভাবে বীমা কোম্পানিগুলোর ওপরও পড়তে পারে। কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয়ের সঙ্গে বীমা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ বীমা কোম্পানির প্রধান কার্যালয় মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকায়। ফলে আইডিআরএ আগারগাঁওয়ে চলে গেলে নিয়মিত দাপ্তরিক যোগাযোগে সময় ও যাতায়াত ব্যয় বাড়তে পারে। তাঁর মতে, নতুন কার্যালয়ের সুবিধার পাশাপাশি বাড়তি ব্যয় ও বীমা খাতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বীমা বিশ্লেষক ও আইডিআরএর সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লা দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান কার্যালয়ের সাজসজ্জা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়েছে। নতুন ভবনে গেলে আবারও সংস্কার ও সাজসজ্জায় অর্থ খরচ করতে হবে। এসব ব্যয়ের পুনর্বিক্রয়মূল্যও থাকবে না।
তাঁর মতে, এক ভাড়া ভবন থেকে আরেক ভাড়া ভবনে যাওয়ার পাশাপাশি আইডিআরএর নিজস্ব ভবন নির্মাণ বা নিজস্ব স্থাপনায় যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতের পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
আইডিআরএর জনসংযোগ কর্মকর্তা এবং ৫০ হাজার বর্গফুট জায়গা খোঁজার কমিটির সদস্য সাদিক আরমান জানিয়েছেন, কার্যালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জায়গার ভাড়া নিয়ে আলোচনা চলছে এবং দাম নির্ধারণে আরও সময় লাগবে।
তিনি বলেন, বর্তমান কার্যালয়ে প্রায় ৩৩ হাজার বর্গফুট জায়গা থাকলেও ভবনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো জায়গা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ছোট জায়গায় গাদাগাদি করে কাজ করতে হচ্ছে। খাতের স্বার্থে এ পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন।
নতুন কার্যালয়ের সংস্কার ও স্থানান্তরে কত টাকা এককালীন ব্যয় হবে, সে হিসাবও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে কার্যালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আইডিআরএকে একদিকে বাড়তি বার্ষিক পরিচালন ব্যয়, অন্যদিকে নতুন ভবনের সংস্কার ও স্থানান্তরের প্রাথমিক ব্যয়—দুই দিকই বিবেচনায় নিতে হবে।









