বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, কম বেসরকারি ঋণপ্রবাহ ও ব্যাংকিং খাতের চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে বৈদেশিক লেনদেন ও রেমিট্যান্সে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক মুদ্রানীতি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় নিয়ে মানুষের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং দেশে জ্বালানি মূল্যের সমন্বয় মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রভাবও চাহিদা ও ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৩ সেপ্টেম্বরের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকেও জ্বালানি মূল্য ও নতুন বেতন কাঠামোকে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২ দশমিক ২ শতাংশে। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
শিল্প উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বলতাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদার অনিশ্চয়তা ব্যবসা ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আর্থিক খাতের চাপকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
পুনরুদ্ধারে ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা প্যাকেজের কথা জানিয়েছে। এর আওতায় মূল শিল্প, কৃষি এবং ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। বন্ধ বা সংকটে থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতেও সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি নথি অনুযায়ী, এই প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, উদ্যোগটির মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতির সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ বাড়াতে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের সীমাবদ্ধতা কমানো, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং আর্থিক খাতে সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বেসরকারি ঋণে গতি নেই
মুদ্রানীতি কিছুটা শিথিল করার পর অর্থবাজারে সুদের হারে চাপ কমার লক্ষণ দেখা গেলেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা এখনো দুর্বল। ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিনিয়োগের ধীরগতি, ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নীতিগত অবস্থানেও মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে বর্তমানে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ দেখানো হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের জুনে মোট বকেয়া ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছিল। মার্চে এ হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
এ অবস্থায় ব্যাংক পুনর্গঠন, মূলধন শক্তিশালী করা, ঋণ আদায় বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটাতে নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো, ঋণ ক্ষতির হিসাবায়নে Expected Credit Loss পদ্ধতি এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদারের উদ্যোগের কথাও বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে।
রেমিট্যান্সে স্বস্তি, লেনদেন ভারসাম্যে চাপ
বৈদেশিক খাতে অবশ্য কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টস ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিলেও রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ বৈদেশিক খাতে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে বলে মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে ভিন্নতা
আগামী অর্থবছরে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার দ্রুতগতিতে হবে—এমন প্রত্যাশা করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। বরং ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাসেও ভিন্নতা রয়েছে। জুলাইয়ে আইএমএফ বাংলাদেশে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির নথিতে আইএমএফের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সামনে যেসব ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় বাহ্যিক ঝুঁকির একটি হলো মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত। সংঘাত দীর্ঘ হলে জ্বালানি ও সারের সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় আরও চাপে পড়তে পারে। এতে উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও নতুন করে চাপের মুখে পড়তে পারে।
এর বাইরে বৈশ্বিক সুদের হার, আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য, বৈদেশিক চাহিদা, দেশের জ্বালানি সরবরাহ, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট—সবগুলো বিষয়ই অর্থনীতির গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। আইএমএফও ব্যাংকিং খাতের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি ও বৈদেশিক চাপকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য সামলাতে হচ্ছে—একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানো। অতিরিক্ত কড়াকড়ি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও ধীর করতে পারে, আবার দ্রুত তারল্য বাড়ানোর পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতির পরিবর্তন অনুযায়ী তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নীতি সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে লক্ষ্য রাখা হয়েছে মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে এগিয়ে নেওয়ার দিকে। এই পুনরুদ্ধারের গতি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কতটা অনুকূলে আসে তার ওপর।









