‘জয় বাংলা ব্রিগেড’ নামে একটি সংগঠনের জুম মিটিংয়ে অংশ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি আবারও পিছিয়েছে। নতুন করে আগামী ১৫ অক্টোবর শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।
বুধবার ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মঈন উদ্দিন চৌধুরী ছুটিতে থাকায় ভারপ্রাপ্ত বিচারক মোসাদ্দেক মিনহাজ শুনানির নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। বেঞ্চ সহকারী গোলাম নবী এ তথ্য জানিয়েছেন।
শুনানিকে কেন্দ্র করে সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিনসহ চার নারী আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে তাঁদের প্রিজনভ্যানে তোলা হয়। সেখান থেকেই সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন তুহিন।
তিনি বলেন, তাঁর এলাকার মানুষ জানেন, তিনি বা তাঁর সহকর্মীরা কোনো অন্যায়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা হত্যার সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর দাবি, তাঁরা শুধু রাজনীতি করেছেন। আওয়ামী লীগ করার কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা ও কারাবাসের ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
প্রিজনভ্যান থেকে তুহিন বলেন, “আমরা আওয়ামী লীগ করি, আওয়ামী লীগ করছি, আওয়ামী লীগ করব। আওয়ামী লীগ করার অপরাধে যদি ফাঁসিও হয়, আওয়ামী লীগই করব।”
তিনি আরও বলেন, রাজনীতি করা তাঁর গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার। কোনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত নয় দাবি করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা অপরাধ কি না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিরপরাধ ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন; তাই তাঁদের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।
তুহিনের সঙ্গে আদালতে হাজির হওয়া অন্য তিন নারী আসামিও নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। পরে তাঁদের বহনকারী প্রিজনভ্যান আদালত প্রাঙ্গণ ছেড়ে যায়।
মামলার পটভূমি
মামলাটি ‘জয় বাংলা ব্রিগেড’-এর একটি অনলাইন বৈঠককে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ওই জুম মিটিংয়ে শেখ হাসিনাকে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয় এবং সরকার উৎখাতের জন্য গৃহযুদ্ধের কথাও বলা হয়েছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে ৫৭৭ জন ওই অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মো. এনামুল হক শেখ হাসিনাসহ ৭৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলাটি করেন। পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৬ ধারায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে তাঁকেই মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ মোট ২৮৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় বলে মামলার আগের কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আসামিদের দেশত্যাগের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় এবং পলাতকদের আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
মামলার ২৮৬ আসামির মধ্যে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি পলাতক রয়েছেন। এর মধ্যে শেখ হাসিনার নামও রয়েছে। অন্যদিকে সাবিনা আক্তার তুহিনসহ গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন আসামি কারাগারে রয়েছেন। মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি নিয়ে চলতি বছর একাধিকবার তারিখ পরিবর্তন হয়েছে। জানুয়ারিতে শুনানি শুরুর পর ফেব্রুয়ারি, জুন, জুলাইসহ বিভিন্ন সময়ে আদালত পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
যাঁদের নাম আলোচনায়
শেখ হাসিনা ও সাবিনা আক্তার তুহিন ছাড়াও মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ড. রাব্বি আলম, জয় বাংলা ব্রিগেডের সদস্য কবিরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, এলাহী নেওয়াজ মাছুম, জাকির হোসেন জিকু, অধ্যাপক তাহেরুজ্জামান, এ কে এম আক্তারুজ্জামান, আজিদা পারভীন পাখি, শাহীন, অ্যাডভোকেট এ এফ এম দিদারুল ইসলাম, মাকসুদুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ রুবিনা আক্তার, সাবেক সংসদ সদস্য পংকজ নাথ, লায়লা বানু, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, রিতু আক্তার, নুরুন্নবী নিবির, সাবিনা বেগম ও শরিফুল ইসলাম রমজান।
এখন ১৫ অক্টোবরের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ গঠনের বিষয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পাবে। অভিযোগ গঠন হলে মামলাটি পরবর্তী বিচারিক ধাপে এগোবে; আর অভিযোগ গঠন না হলে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।








