ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এক প্রবাসীর অর্ধনির্মিত বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ডাকাতির অভিযোগ উঠেছে পাঁচ সশস্ত্র যুবকের বিরুদ্ধে। ডাকাতির সময় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরকে অস্ত্রের মুখে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে তার মাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগও করা হয়েছে। ঘটনার ভিডিও ধারণ করে পরে ওই নারী ও তার ছেলেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আরও ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় রাজিব (২৩) নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে গফরগাঁও উপজেলার চরআলগী ইউনিয়নের চর কালীবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। শুক্রবার বিকেলে ভুক্তভোগী নারী থানায় অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে চর কালীবাড়ি এলাকার তাহের উদ্দিনের ছেলে শরীফ (২৩), আরিফ (২১), মমিনের ছেলে ফাহিম (২২), মোফাজ্জলের ছেলে রাজিব (২৩) এবং নূরুলের ছেলে এনামুল (২২) ওই প্রবাসীর অর্ধনির্মিত বাড়িতে প্রবেশ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচজনের কাছেই অস্ত্র ছিল।
ওই সময় বাড়িতে থাকা ১৪ বছর বয়সী কিশোরের কাছে তারা পানি চান। কিশোরটি জগ ও গ্লাসে পানি নিয়ে দরজার কাছে এলে যুবকেরা তাকে ধরে ফেলেন। পরে অস্ত্রের মুখে তাকে বাড়ির দরজার পাশের একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।
এরপর অভিযুক্তরা ঘরে ঢুকে কিশোরের মাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা আলমারি ভেঙে নগদ ৫ লাখ টাকা নিয়ে যান। একই সঙ্গে আলমারিতে থাকা স্বর্ণালংকার, গলার হার ও কানের দুলসহ প্রায় দুই ভরি স্বর্ণ, যার আনুমানিক মূল্য ৫ লাখ টাকা, এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়।
ডাকাতির পর ঘটনাটি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী নারী। পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির বাইরে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা কিশোরের গলায় চাপাতি ধরে তার মাকে সেখানে নিয়ে আসা হয়। এরপর ছেলের সামনে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগে নারী পাঁচজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে দুজন ধর্ষণে অংশ নেন এবং অন্যরা বাইরে অবস্থান করছিলেন।
ঘটনার সময় রাজিব ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই নারী ও তাঁর ছেলেকে ভয় দেখিয়ে বলা হয়, তিন দিনের মধ্যে আরও ২ লাখ টাকা দিতে হবে। বিষয়টি কাউকে জানালে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযুক্তরা চলে যাওয়ার পর মা ও ছেলের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। পরে স্থানীয়রা গফরগাঁও থানা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে এবং অভিযুক্তদের আটক করতে অভিযান চালায়।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে চর কালীবাড়ি গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে একটি নির্জন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় চারজন পালিয়ে গেলেও রাজিবকে আটক করা সম্ভব হয়।
পুলিশের দাবি, আটকের সময় ধর্ষণের ভিডিও ধারণে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি রাজিব পানিতে ফেলে দেন। পরে ওই স্থানে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ফোনটি উদ্ধার করে। ভিডিও ধারণের অভিযোগের সত্যতা এবং উদ্ধার করা মোবাইল ফোনের তথ্যও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী নারীর দেবর বলেন, বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তাঁর ভাবি নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে থাকতেন। তাঁর অভিযোগ, দুর্বৃত্তরা ভাতিজাকে জিম্মি করে ভাবির ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের উপযুক্ত বিচার দাবি করেন।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গফরগাঁও সার্কেল) মনতোষ বিশ্বাস বলেন, ওই নারী পাঁচজনের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন। তাঁর অভিযোগে ধর্ষণ, ছেলেকে জিম্মি করে রাখা, বাড়িতে ভাঙচুর এবং টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
মনতোষ বিশ্বাস জানান, এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযোগের প্রতিটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। মেডিকেল পরীক্ষার প্রতিবেদনসহ অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিশ্চিত করা হবে। ভিডিও ধারণের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনায় মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি পলাতক অন্য ব্যক্তিদের আটক করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত শেষে অভিযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।









