ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৪ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে ২৬ ঘণ্টার বেশি সময় পর গ্যাস পেয়েছেন গ্রাহকেরা। পাইপলাইনের জরুরি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে বুধবার সকাল ১০টার পর সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর, সদর ও সরাইল উপজেলার ২৩ হাজারের বেশি আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহককে দীর্ঘ সময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
গ্যাস না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন বাসাবাড়ির মানুষ। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী রাত ১০টার মধ্যে গ্যাস ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশায় অনেকে বিকল্প ব্যবস্থা নেননি। কিন্তু রাত বাড়লেও গ্যাস না আসায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে যায়। বুধবার সকালেও অনেক পরিবারকে খাবার প্রস্তুত করতে বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হয়েছে।
সরাইলের পাঠানপাড়া এলাকার কলেজশিক্ষক ছাকিয়া বেগম বলেন, মঙ্গলবার রাত ১০টার মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল। রাতে গ্যাস এলে তিনি রান্নাবান্নার কাজ শেষ করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পরও গ্যাস না আসায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বাইরে খাবার কিনতে গেলেও হোটেল-রেস্তোরাঁয় অতিরিক্ত ভিড় থাকায় নাশতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত চিড়া খেয়েই তাঁকে বাড়ি থেকে বের হতে হয়।
ছাকিয়া বেগমের মতে, মেরামতের কাজ শেষ হতে যদি আরও বেশি সময় লাগবে—এমন তথ্য আগে জানানো হলে গ্রাহকেরা নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিতে পারতেন।
শুধু আবাসিক গ্রাহকেরাই নন, গ্যাসনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্যাস না পাওয়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরাও দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকেন। গ্যাসের জন্য স্টেশনগুলোতে তৈরি হয় দীর্ঘ সারি।
অটোরিকশাচালক সাব্বির মিয়া বলেন, গ্যাস পাওয়ার আশায় মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও গ্যাস না আসায় রাত একটার দিকে তাঁকে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। বুধবার সকাল ১০টার পর গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ার খবর পেলেও তখন ফিলিং স্টেশনগুলোতে বড় লাইন তৈরি হয়ে যায়। ফলে সারা দিন অপেক্ষা করেও গ্যাস নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, গ্যাসের এই সংকটের কারণে দুই দিনের আয় কার্যত নষ্ট হয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের জন্য দীর্ঘ সময় জ্বালানি সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়া সরাসরি আয়-রোজগারে প্রভাব ফেলে।
এর আগে সোমবার বিকেলে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয় থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের সময় জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে টানা ১৪ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। সেই হিসাবে রাত ১০টার মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পরও গ্যাস না ফেরায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে রাতের রান্না, খাবারের দোকান ও পরিবহন খাতের মানুষের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে।
বাখরাবাদ গ্যাসের ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক ও আঞ্চলিক প্রধান মো. শফিকুল হক জানান, জরুরি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্যই সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। সদর উপজেলার ঘাটুরা এলাকায় কাজ করার কথা থাকলেও সেখানে পানি জমে থাকায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু ও শেষ করা সম্ভব হয়নি। ওই স্থানের পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকে তাঁদের জানা ছিল না বলেও তিনি জানান।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাজ শেষ হওয়ার পর বুধবার সকালে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়। এখন থেকে গ্যাস সরবরাহে আর সমস্যা হবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
ঘটনাটি আবারও দেখিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে মেরামতকাজ দীর্ঘ হলে গ্রাহকদের দ্রুত অবহিত করা কতটা জরুরি। বিশেষ করে গ্যাসের মতো দৈনন্দিন জীবন ও পরিবহনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সেবার ক্ষেত্রে সময়সূচিতে পরিবর্তন হলে তা আগেভাগে জানানো গেলে বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষ বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবার সেই অতিরিক্ত সময়ের অনিশ্চয়তাই গ্রাহকদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।









