জরুরি সময়ে হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় অনেককেই বিদ্যুৎ, গ্যাস, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে সমস্যায় পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ঋণের একটি বিশেষ সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘জরুরি পেমেন্ট সেবা’ নামে এই ব্যবস্থায় যোগ্য গ্রাহকেরা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে প্রচলিত ঋণের মতো এই অর্থ গ্রাহকের হাতে নগদ হিসেবে দেওয়া হবে না। বরং নির্দিষ্ট জরুরি বিল বা পরিশোধের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং আবেদনের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হবে। ফলে গ্রাহকের তাৎক্ষণিক অর্থের ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি ঋণের অর্থ নির্দিষ্ট প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হবে।
যেসব খরচে ব্যবহার করা যাবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের আওতায় বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় বিল ও পরিশোধের ক্ষেত্রে এই ঋণ ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, মোবাইল ফোনে টাকা ভরা, সন্তানের স্কুলের বেতন এবং হাসপাতালের বিল।
এ ছাড়া ব্যাংক হিসাবে থাকা মাসিক সঞ্চয় প্রকল্পের কিস্তি ও বিমার কিস্তি পরিশোধেও এই সুবিধা ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ, যেসব খরচ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা প্রয়োজন, সাময়িক অর্থসংকট দেখা দিলে সেগুলো মেটাতে এই ব্যবস্থা কাজে লাগতে পারে।
হাতে নগদ টাকা পাবেন না গ্রাহক
এই ঋণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, অনুমোদিত অর্থ গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে আলাদাভাবে জমা হবে না। গ্রাহক যে বিল বা নির্ধারিত পরিশোধ করতে চান, তার প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যাংকিং আবেদনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
এ কারণে এটি সাধারণ নগদ ঋণের চেয়ে আলাদা। স্বল্প সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি পূরণ করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
ঋণের মেয়াদ রাখা হয়েছে সাত দিন, ১৫ দিন ও ৩০ দিন। ঋণের ওপর কোনো সুদ নেওয়া হবে না। তবে ব্যাংক নির্ধারিত হারে মাশুল নিতে পারবে। ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদ যত বেশি হবে, মাশুলও তত বাড়বে।
১০ হাজার টাকার ঋণে সর্বোচ্চ মাশুল ১৩০ টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ মাশুল নির্ধারণ করে দিয়েছে। ৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণে সাত দিনের জন্য সর্বোচ্চ মাশুল তিন টাকা, ১৫ দিনের জন্য চার টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ছয় টাকা।
২৫১ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ঋণে মাশুল হবে যথাক্রমে পাঁচ, আট ও ১৫ টাকা। ৫০১ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণে সাত, ১২ ও ২০ টাকা মাশুল দিতে হবে।
এক হাজার এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সাত, ১৫ ও ৩০ দিনের জন্য মাশুল হবে যথাক্রমে ১০, ২০ ও ৩০ টাকা। দুই হাজার এক থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণে এই মাশুল দাঁড়াবে ১৫, ৩০ ও ৫০ টাকা।
তিন হাজার এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণে সাত দিনের জন্য সর্বোচ্চ ২০ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৪০ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ৭০ টাকা মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাঁচ হাজার এক থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে মাশুল হবে ২৫, ৫০ ও ৯০ টাকা। আর সাত হাজার এক থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণে সাত দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৭০ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ১৩০ টাকা মাশুল দিতে হবে।
অর্থাৎ, কোনো গ্রাহক ১০ হাজার টাকা ৩০ দিনের জন্য নিলে নির্ধারিত মাশুলসহ সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৩০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। একই অর্থ ১৫ দিনের জন্য নিলে মাশুল হবে ৭০ টাকা এবং সাত দিনের জন্য নিলে ৩৫ টাকা।
ব্যাংকিং আবেদনের ব্যবহারকারীদের জন্য সুবিধা
বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যাংকের নিজস্ব মোবাইল ব্যাংকিং আবেদন ব্যবহারকারীদের এই সুবিধার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সিটি ব্যাংকের সিটিটাচ, ইসলামী ব্যাংকের সেলফিন, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নেক্সাসপে এবং সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব আবেদন রয়েছে।
দেশে ব্যাংকিং আবেদন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে এই আড়াই কোটি মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ পাওয়ার অধিকারী হবেন না। গ্রাহকের ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।
অর্থাৎ, কোনো ব্যাংকের আবেদন ব্যবহার করলেই সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা ঋণ নিশ্চিত—এমন নয়। ব্যাংকের নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হবে।
ডিজিটাল লেনদেনে বাড়তে পারে আগ্রহ
সিটি ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার মনে করেন, উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধের সময় গ্রাহকের সাময়িক অর্থসংকট কাটাতে এটি সহায়ক হতে পারে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি অর্থের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি এই সুবিধার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও থাকতে পারে। গ্রাহকেরা যখন বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিশোধে ব্যাংকিং আবেদন ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হবেন, তখন ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।
অরূপ হায়দার আরও বলেন, শুরুতে এই উদ্যোগের পরিসর সীমিত মনে হলেও ভবিষ্যতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর আশা, ব্যাংকগুলো দ্রুত এই সুবিধা চালু করলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক এর আওতায় আসতে পারবেন।
বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবহারের পরিধি বাড়ানোর যে প্রচেষ্টা চলছে, জরুরি পেমেন্ট সেবাকে সেই ধারারই একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে স্বল্প সময়ের জন্য অল্প পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়—এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকের জন্য এটি একটি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। তবে সুবিধাটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর বাস্তবায়ন, গ্রাহকের যোগ্যতা নির্ধারণ এবং সেবাটি ব্যবহারের সহজতার ওপর।










