আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মুদ্রার বিনিময় হার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং বিদেশে অর্থ পাঠানো—সব ক্ষেত্রেই বিনিময় হারের ওঠানামার প্রভাব পড়ে। তাই প্রতিদিনের মুদ্রাবাজারের গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখেন ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সাধারণ গ্রাহকেরা।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দেশের আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলার ১২২ টাকা ৭৬ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দর কিছুটা বেড়ে যাওয়ার পর আবার কমে এই পর্যায়ে আসায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তুলনামূলক স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসের শুরুতে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দর ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায় স্থিতিশীল ছিল। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে ডলারের দর বাড়তে থাকে এবং সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় পৌঁছায়। বর্তমানে তা কমে ১২২ টাকা ৭৬ পয়সায় অবস্থান করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর প্রভাবে ডলারের দরে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেলেও বর্তমানে বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা নেই। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার সঙ্গে জোগান মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকায় ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়নি।
আজকের মুদ্রা বিনিময় হার
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে ৭ সেপ্টেম্বরের উল্লেখিত সর্বনিম্ন বিনিময় হার হলো—
| মুদ্রা | বাংলাদেশি টাকায় বিনিময় হার |
|---|---|
| ইউএস ডলার | ১২২ টাকা ৭৬ পয়সা |
| ইউরো | ১৪২ টাকা ৫৬ পয়সা |
| পাউন্ড | ১৬৫ টাকা ৯৮ পয়সা |
| কানাডিয়ান ডলার | ৮৮ টাকা ৬৮ পয়সা |
| অস্ট্রেলিয়ান ডলার | ৮৮ টাকা ৪১ পয়সা |
| চীনা ইয়েন | ১৮ টাকা ৩০ পয়সা |
| সিঙ্গাপুরি ডলার | ৯৬ টাকা ৮৮ পয়সা |
| ভারতীয় রুপি | ১ টাকা ২৯ পয়সা |
| মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত | ৩০ টাকা ৩৯ পয়সা |
| সৌদি রিয়াল | ৩২ টাকা ৯৭ পয়সা |
| কাতারি রিয়াল | ৩৩ টাকা ৭১ পয়সা |
| কুয়েতি দিনার | ৩৯৬ টাকা ৯৪ পয়সা |
| সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম | ৩৩ টাকা ৪৬ পয়সা |
ডলারের দর কমে আসার বিষয়টি আমদানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমদানির অর্থ পরিশোধে যেসব প্রতিষ্ঠানকে ডলার কিনতে হয়, বিনিময় হার কম থাকলে তাদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে। বিশেষ করে শিল্পকারখানার কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে বিনিময় হারের পরিবর্তন মোট ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে। আমদানি ব্যয় কমলে ব্যবসায়ীদের খরচ কমার সুযোগ তৈরি হয়, যদিও পণ্যের বাজারদর কেবল বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে না। আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য, পরিবহন ব্যয়, শুল্ক-কর, স্থানীয় সরবরাহ ও বাজারের চাহিদার মতো বিষয়ও চূড়ান্ত দামে ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার জোগানের ক্ষেত্রে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লে দেশে ডলারের সরবরাহও বাড়ে। এতে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয় এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ কমতে পারে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ—সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। জুলাইয়ের শুরুতে ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় ওঠার পর এখন ১২২ টাকা ৭৬ পয়সায় নেমে আসা সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার কোনো স্থির সংখ্যা নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি, দেশের আমদানি-রপ্তানি, বৈদেশিক লেনদেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং ব্যাংকগুলোর নিজস্ব লেনদেনের ধরন অনুযায়ী দর পরিবর্তিত হতে পারে। একই মুদ্রার ক্রয় ও বিক্রয় হারেও পার্থক্য থাকতে পারে।
এ কারণে বিদেশে অর্থ পাঠানো, আমদানি-রপ্তানি বা অন্য কোনো বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ বিনিময় হার যাচাই করা প্রয়োজন।
নোট: প্রতিবেদনে দেওয়া হার ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সময়, ব্যাংক ও লেনদেনের ধরন অনুযায়ী প্রকৃত বিনিময় হার পরিবর্তিত হতে পারে।










