লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ থাকছে এক্স-রে ও বিভিন্ন রোগ নির্ণয় পরীক্ষা। শ্বাসকষ্টে ভোগা নিউমোনিয়ার রোগীদের প্রয়োজনীয় নেবুলাইজার দেওয়াও নিয়মিত সম্ভব হচ্ছে না। অথচ হাসপাতালটিতে জেনারেটর রয়েছে। সমস্যা হলো, সেটি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেলের বরাদ্দ নেই।
মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শের অপেক্ষায় আছেন রোগী ও স্বজনেরা। কাঞ্চনপুর গ্রামের পারুল বেগম ও সুইটি আক্তার প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ছয় বছরের এক শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে অপেক্ষা করছিলেন। চিকিৎসক দেখানোর পর শিশুটির এক্স-রে করানোর কথা থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় এক্স-রে কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর অনেক রোগীকে পরীক্ষা না করিয়েই বাড়ি ফিরে যেতে দেখা যায়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব রোগীকে পরে আবার হাসপাতালে আসতে হবে, অথবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে হবে। এতে সময় ও অর্থ—দুই-ই বাড়ছে।
পারুল বেগম বলেন, “এক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ নেই। গরমে বাচ্চাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। ডাক্তার দেখানোর পর এক্স-রে করানোর কথা ছিল। কিন্তু কখন বিদ্যুৎ আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই কী করব বুঝতে পারছি না।”
হাসপাতালে চার দিন ধরে জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছয় বছরের মাইমুনা আক্তারের চিকিৎসা চলছে। তার মা মারুফা বেগম সাইচা এলাকা থেকে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লোডশেডিং থাকায় অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা
সরেজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষের সামনে রোগী ও স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় রোগ নির্ণয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বন্ধ ছিল। সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালের বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতি চালু রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় একের পর এক সেবা বন্ধ হয়ে যায়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন অন্তত আটবার লোডশেডিং হয়েছে। এতে বহির্বিভাগের রোগী, ভর্তি থাকা রোগী এবং তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাতেও। হাসপাতাল কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৮৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের শ্বাসকষ্ট কমাতে নেবুলাইজার দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে নেবুলাইজার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
টিকা সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে টিকা সংরক্ষণেও সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। চর আবাবিল গ্রাম থেকে চার বছরের শিশুকে টিকা দিতে এসেছিলেন মিনু আক্তার। হাসপাতালে এসে বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
মিনু আক্তার বলেন, “দূর থেকে কষ্ট করে বাচ্চাকে টিকা দিতে হাসপাতালে এসেছি। এসে দেখি বিদ্যুৎ নেই। গরমের মধ্যে বাচ্চাকে নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। হাসপাতালে এসে যদি টিকার জন্যও এতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কষ্টের শেষ কোথায়?”
হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা সংরক্ষণ, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জরুরি সেবার জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে এসব সেবা একসঙ্গে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জেনারেটর আছে, নেই ডিজেল
বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে একটি জেনারেটর রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একজন ব্যক্তি জেনারেটরটি দান করেছেন। কিন্তু জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেলের বরাদ্দ না থাকায় সেটি নিয়মিত ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, জেনারেটর থাকলেও ডিজেল না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা থাকে না। ফলে এক্স-রে, প্যাথলজি পরীক্ষা এবং নেবুলাইজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা ব্যাহত হয়। গত দুই থেকে তিন মাস ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়েছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একটি আইপিএস থাকলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে সেটিও অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে বিদ্যুৎনির্ভর কিছু যন্ত্রপাতি চালু রাখা সম্ভব হয় না। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবাও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অস্ত্রোপচার কক্ষ থাকলেও কার্যক্রমে সংকট
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আধুনিক সরঞ্জামসমৃদ্ধ অস্ত্রোপচার কক্ষ রয়েছে। তবে হাসপাতাল সূত্রের দাবি, চিকিৎসক ও জ্বালানি-সংকটসহ বিভিন্ন কারণে গত তিন বছর ধরে সেখানে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ফলে হাসপাতালের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। একদিকে বিদ্যুৎ-সংকট, অন্যদিকে জ্বালানি ও জনবল-সংকট—সব মিলিয়ে সরকারি এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রায় চার লাখ মানুষের নির্ভরতার জায়গা
২০০৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। সময়ের সঙ্গে এলাকার জনসংখ্যা ও চিকিৎসাসেবার চাহিদা বাড়লেও হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার লাখ মানুষ এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর চিকিৎসাসেবার জন্য নির্ভরশীল। এ কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক সমস্যা হলেও এর প্রভাব পড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের ওপর।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, গত তিন বছর ধরে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় পাওয়া একটি বড় জেনারেটরসহ কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এসব যন্ত্র কার্যকরভাবে ব্যবহার করা না গেলে সরকারি অর্থে তৈরি বা কেনা স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সুফলও রোগীরা পুরোপুরি পাচ্ছেন না।
সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মামুনুর রশিদ বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে চিকিৎসাসেবায় সমস্যা হয় এবং রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ে। হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও সেটি চালানোর জন্য জ্বালানি প্রয়োজন। জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও রোগীদের সেবা দিতে তাঁরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শফিউল আলম। তিনি বলেন, দৈনিক চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে লোডশেডিং বেড়েছে। বিষয়টি জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
রায়পুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি হাসপাতালের বিদ্যুৎ সমস্যার চিত্র নয়। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ঘাটতি থাকলে একটি হাসপাতালের বিদ্যমান সক্ষমতাও কীভাবে রোগীদের কাজে আসে না, এই পরিস্থিতি তারই উদাহরণ।










