,

নারীর অগ্রগতি থেকে নিরাপত্তাহীনতা: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের নারী বাস্তবতা

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আছে এবং থাকবে। শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে মানুষের মতপার্থক্যও কম নয়। তার সরকারের অনেক নীতি, সিদ্ধান্ত কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই। নারী শিক্ষা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং নারী ও পুরুষের বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য অনেক দেশের তুলনায় দীর্ঘদিন ধরেই এগিয়ে ছিল।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম-এর বৈশ্বিক লিঙ্গ বৈষম্য প্রতিবেদন ২০২৪-এ দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল প্রথম। বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯৯তম। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং শিক্ষায় নারী পুরুষের ব্যবধান কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল উল্লেখযোগ্য।

এটি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারপত্রের তথ্য নয়। আন্তর্জাতিক একটি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান।

কিন্তু এই জায়গা থেকেই গত দুই বছরের বাংলাদেশকে দেখলে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি নারীর অগ্রগতির একটি পর্যায় থেকে ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার দিকে যাচ্ছি যেখানে নারীর নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং জনপরিসরে তার উপস্থিতি নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ছে?
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরের ঘটনাপ্রবাহ অন্তত সেই প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে।

২০২৪ এর আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। ওই বছরের সেপ্টেম্বরেই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পর্যবেক্ষণে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়।

আগস্টে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হওয়ার নথিভুক্ত ঘটনা ছিল ১৪৭টি। সেপ্টেম্বরে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৬-তে। প্রায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি।

ধর্ষণের ঘটনা ৮ থেকে বেড়ে হয় ১৩। গণধর্ষণের ঘটনা ৭ থেকে বেড়ে হয় ১১। বিভিন্ন কারণে হত্যার শিকার নারী ও কন্যাশিশুর সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯।
এক মাসের পরিসংখ্যান দিয়ে কোনো দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কিন্তু এটি যে একটি সতর্ক সংকেত ছিল তা এখন পরবর্তী ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে আরও স্পষ্ট হয়।

এরই মধ্যে কক্সবাজারে কয়েকজন নারীকে প্রকাশ্যে লাঠি দিয়ে মারধর, হেনস্তা এবং জোর করে কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দ্য ডেইলি স্টার অন্তত সাতটি ভিডিও পরীক্ষা করে একই দলের হাতে নারীদের হয়রানির একাধিক ঘটনা শনাক্ত করেছিল। এমনকি একজন নারী নিজেকে পর্যটক হিসেবে পরিচয় দিয়েও রেহাই পাননি।

এখানে বিষয়টি শুধু নারী নির্যাতনের নয়। প্রশ্নটি আরও বড়।
একজন নারী রাস্তায় বের হলে তিনি কতটা নিরাপদ। জনসমক্ষে তার সঙ্গে কী আচরণ করা হবে। তার পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়ে অন্য কেউ তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নিজের হাতে তুলে নেবে কি না। এই প্রশ্নগুলোই তখন সামনে আসতে শুরু করেছিল।

২০২৫ সালে সংখ্যাগুলো আর ছোট ছিল না
একটি ঘটনা দিয়ে পরিবর্তন বোঝা কঠিন। তাই পুলিশের পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৭১টি। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৯৩৯টি। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে বৃদ্ধিটা আরও স্পষ্ট।
২০২৪ সালে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৬৮টি। বৃদ্ধির হার প্রায় ২৭ শতাংশ।

২০২৫ সালের ধর্ষণের মামলাগুলোর মধ্যে ৫ হাজার ১৭১ জন ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং ১ হাজার ৮৯৭ জন শিশু।
আরও একটি তথ্য বিবেচনায় নেওয়া দরকার। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে নিউ এজ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৬ মাসে দেশে ৯ হাজার ১৪৩টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো নিছক কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এগুলো মামলা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কাছে পৌঁছানো অভিযোগ।
অবশ্য এটাও মনে রাখতে হবে যে মামলা বাড়া মানেই বাস্তবে অপরাধ ঠিক একই হারে বেড়েছে এমন সরল সমীকরণ করা যায় না। মানুষ বেশি মামলা করতে পারে, রিপোর্টিং বাড়তে পারে, পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর প্রবণতা পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু যখন একাধিক স্বাধীন পর্যবেক্ষণ একই সময়ে একই ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখায় তখন বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ থাকে না।

সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গাটি শিশুদের ক্ষেত্রে
নারী নির্যাতনের যেকোনো পরিসংখ্যানই উদ্বেগের। কিন্তু শিশুদের তথ্য দেখলে উদ্বেগ আরও গভীর হয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ২৫০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে হয় ৪৪১। অর্থাৎ প্রায় ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি।

বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ।
২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ছয় বছরের কম বয়সী ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ছিল ১৪। ২০২৫ সালে একই সময়ে তা বেড়ে হয় ৪৮।
৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে সংখ্যা ৪০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৬। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৪। জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের হিসাবেও একই প্রবণতা দেখা যায়। আসক-এর তথ্যে ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসে ১৭৫ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০৬। বৃদ্ধি প্রায় ৭৫ শতাংশ।
আর একটি তথ্য বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই ধর্ষণের শিকার কন্যাশিশুর সংখ্যা ২০২৪ সালের পুরো বছরের ২৩৪ জনকে ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পর্যবেক্ষণও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে তারা ৪৮১টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করে। অথচ পুরো ২০২৪ সালে তাদের নথিভুক্ত ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫১৬টি। ছয় মাসে পাওয়া ৪৮১ ভুক্তভোগীর মধ্যে ৩৪৫ জনই শিশু।
এই সংখ্যাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা আর শুধু রাজনৈতিক নয়। এটি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

২০২৬ সালেও পরিস্থিতির উন্নতি চোখে পড়ছে না
কেউ যদি মনে করেন ২০২৫ ছিল একটি ব্যতিক্রমী বছর, ২০২৬ সালের তথ্য সেই আশাকে খুব বেশি জায়গা দেয় না।
মানবাধিকার সহায়তা সমিতি বা HRSS-এর ২০২৬ সালের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২। অর্থাৎ তাদের পর্যবেক্ষণে এক বছরের ব্যবধানে সহিংসতা বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ।
আসক-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৪০০ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ জনকে। শুধু জুলাই মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১ জন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবেও ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৬৬৭ জন নারী ও শিশু। এ সময়ে ২৯১ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং বিভিন্ন ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৪১ জন।
একটি বছরকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু পরপর দুই বছরের তথ্য একই দিকে যেতে থাকলে সেটিকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটানো কঠিন।

সমস্যাটা শুধু ধর্ষণ নয়
আমার কাছে আরও উদ্বেগের জায়গা এখানেই। নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু ধর্ষণ, হত্যা কিংবা পারিবারিক নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নারীর জনপরিসরে উপস্থিতি নিয়েও নতুন করে এক ধরনের সামাজিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
একজন নারী কী পোশাক পরবেন। কোথায় যাবেন। ফুটবল খেলবেন কি না। কোনো অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন কি না। মঞ্চে উঠবেন কি না। এসব সিদ্ধান্তেও অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করার অধিকার দাবি করছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে মেয়েদের একটি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। স্থানীয় লোকজন ও মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের একাংশ মাঠের স্থাপনা ভাঙচুর করে। পুলিশের ভাষ্যেও স্থানীয় ইসলামপন্থীদের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে আসে। প্রতিবাদকারীদের একজন নারী ফুটবলকে অনৈসলামিক বলে সেটি প্রতিহত করাকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেন। দিনাজপুরেও একই সময়ে মেয়েদের আরেকটি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হয়ে যায়। পরে রংপুরের তারাগঞ্জে নারী ফুটবল ম্যাচ ঠেকাতে ইসলামী আন্দোলনের স্থানীয় এক নেতা কর্মসূচি ঘোষণা করলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে এবং শেষ পর্যন্ত খেলাটি বাতিল হয়। এগুলোকে কেবল কয়েকটি ফুটবল ম্যাচের ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতাটা বোঝা যাবে না।
কারণ খেলাধুলা কোনো অপরাধ নয়। একজন নারী ফুটবল খেলবেন কি না সেটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। সেখানে ধর্মের নামে একটি সংগঠিত গোষ্ঠী যদি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে সেটি কেবল খেলাধুলার ওপর হস্তক্ষেপ নয়। এটি নারী কোথায় এবং কীভাবে জনপরিসরে থাকবে সেই প্রশ্নের ওপরও হস্তক্ষেপ।

নারী শিল্পীদের ক্ষেত্রেও একই চাপ
একই প্রবণতা বিনোদন জগতেও দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভিনয়শিল্পী সংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, মেহজাবীন চৌধুরী, পরীমনি এবং অপু বিশ্বাসের মতো নারী অভিনয়শিল্পীদের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ বা শোরুম উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাধার মুখে পড়ার ঘটনা শিল্পীদের স্বাধীনতার জন্য হুমকি তৈরি করছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামে একটি শোরুম উদ্বোধনে যাওয়ার কথা ছিল মেহজাবীনের। স্থানীয় ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরোধিতার খবরের মধ্যে নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি সেখানে যাননি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একুশে বইমেলায় নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের বই রাখাকে কেন্দ্র করে একটি প্রকাশনীর স্টলে দলবদ্ধভাবে হামলা ও হট্টগোলের ঘটনাও ঘটে। পরে পুলিশ সাময়িকভাবে স্টলটি বন্ধ করে দেয়।

এখানে আবারও সেই একই প্রশ্ন আসে।
নারীকে কি কেবল ঘরের ভেতর নিরাপদ রাখাই আমাদের লক্ষ্য। নাকি তিনি নিজের পেশা, মত, পোশাক, শিল্প এবং জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েও স্বাধীন থাকবেন?

নারী অধিকার সংস্কারের বিরোধিতাও নতুন মাত্রা পেয়েছে
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের নভেম্বরে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। কমিশন বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি, সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব, কর্মক্ষেত্র এবং সহিংসতা প্রতিরোধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করার জন্য শত শত সুপারিশ দেয়। সেই সুপারিশের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধও আমরা দেখেছি। ২০২৫ সালের ৩ মে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের বড় সমাবেশ থেকে নারী সংস্কার কমিশন বিলুপ্ত এবং এর প্রতিবেদন বাতিলের দাবি জানানো হয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর হিসাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষ সেই সমাবেশে অংশ নেয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-ও জানিয়েছে, নারীর উত্তরাধিকার, বৈবাহিক অধিকার এবং সমতার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে আন্দোলনে নামে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে কমিশনের সদস্যদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি এবং সহিংসতায় উসকানির প্রতিবাদ জানিয়ে ১১০ জন নাগরিক যৌথ বিবৃতি দেন। ২২ জন নারী পেশাজীবীও সরকারকে হুমকি ও ঘৃণা ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মার্কিন কমিশন-এর ২০২৫ সালের বাংলাদেশ বিষয়ক তথ্যপত্র-এও নারী সংস্কার কমিশনের সদস্যদের বিরুদ্ধে অপমানজনক বক্তব্য এবং একজন নারী অধিকারকর্মী অধ্যাপককে ধর্মীয় গোষ্ঠীর হুমকির পর বদলির ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

এখানে আমাদের একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা যেমন একটি মৌলিক অধিকার, তেমনি নারীর সমঅধিকারও মৌলিক অধিকার। একটির নামে অন্যটিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও উদ্বেগের কথা বলছে
ইউরোপীয় ইউনিয়ন আশ্রয় বিষয়ক সংস্থা-এর ২০২৫ সালের বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষ আলোকপাত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মূল্যায়নে ২০২৪ সালে বিভিন্ন ধরনের অংশীদার-বহির্ভূত শারীরিক এবং যৌন সহিংসতা-এর দীর্ঘমেয়াদি হার আগের তুলনায় কমে এসেছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এর মধ্যে জনসমক্ষে হামলা এবং গণধর্ষণের ঘটনাও ছিল। তারা এই মূল্যায়নের পক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং আসক-এর পরিসংখ্যান ব্যবহার করেছে।

তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি।
৫ আগস্টের পর নারী নির্যাতন বেড়েছে বলেই সব নারী নির্যাতনের জন্য সরকার পরিবর্তনকে দায়ী করা যাবে না। সেটি হবে বাস্তবতাকে অতিরিক্ত সরল করে দেখা। ধর্ষণের পেছনে বিচারহীনতা আছে। সামাজিক মানসিকতা আছে। পারিবারিক সহিংসতা আছে। পুলিশের সক্ষমতা ও নিষ্ক্রিয়তার প্রশ্ন আছে। মামলা করার প্রবণতা আছে। সংবাদমাধ্যমে রিপোর্টিংয়ের মাত্রা আছে। আরও অনেক কারণ আছে। কিন্তু একই কারণে ৫ আগস্টের পরের পরিবর্তনকে একেবারেই গুরুত্বহীন বলেও পাশ কাটানো যাবে না।
কারণ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ বদলালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বদলাতে পারে। সামাজিকভাবে কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে তারও পরিবর্তন হতে পারে। অপরাধীর মনে শাস্তির ভয় কমে গেলে তার প্রভাব অপরাধের ওপর পড়তেই পারে।

বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে
শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ নারী নির্যাতনমুক্ত ছিল না। এমন দাবি করার কোনো কারণ নেই। ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা এবং কর্মক্ষেত্রে হয়রানি তখনও ছিল এবং সেগুলোও ছিল ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশ নারীশিক্ষা, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং লিঙ্গবৈষম্য কমানোর আন্তর্জাতিক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নেতৃত্বের অবস্থান তৈরি করেছিল।
আজকের প্রশ্ন হচ্ছে সেই অগ্রগতির ভিত কতটা নিরাপদ।
২০২৫ সালে পুলিশের হিসাবে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। আসক-এর হিসাবে ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৭৬ শতাংশ। প্রথম সাত মাসে কন্যাশিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে HRSS-এর পর্যবেক্ষণে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সামগ্রিক সহিংসতাও বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ।

এর পাশাপাশি জনসমক্ষে নারীকে হেনস্তা করা, নৈতিক পুলিশিং, নারী ফুটবল বন্ধের চেষ্টা, নারী শিল্পীদের অনুষ্ঠানে যেতে বাধা এবং নারী অধিকার সংস্কারের বিরুদ্ধে হুমকি ও ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনাগুলোও ঘটছে। এই সবকিছুকে পাশাপাশি রাখলে একটি অস্বস্তিকর চিত্র তৈরি হয়।
একটি দেশ শুধু তখনই নারীর জন্য নিরাপদ নয় যখন নারী ঘরে বসে থাকে। বরং একটি দেশ তখনই নারীর জন্য নিরাপদ যখন সে ঘর থেকে বের হতে পারে, রাস্তায় চলতে পারে, মাঠে খেলতে পারে, নিজের পেশা বেছে নিতে পারে, নিজের পোশাক বেছে নিতে পারে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারে এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বাংলাদেশের নারীরা গত কয়েক দশকে এসব অধিকারের অনেকটাই অর্জন করেছেন। এই অগ্রগতিকে এখন পিছিয়ে দেওয়া হলে সেটি শুধু নারীর ক্ষতি হবে না। বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক অগ্রগতিও পিছিয়ে যাবে।
আমাদের তাই রাজনৈতিক তর্কের বাইরে গিয়ে প্রশ্নটি করতে হবে।
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে নারী কি শুধু অপরাধীর কাছ থেকেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে, নাকি সমাজের একটি অংশ তার স্বাধীনতা এবং জনপরিসরে উপস্থিতিকেও নতুন করে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে?
পরিসংখ্যান একা সেই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর দেয় না। কিন্তু গত দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহ অন্তত এটুকু বলে যে প্রশ্নটি করার মতো যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে।
যে বাংলাদেশ একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় নারী ও পুরুষের বৈষম্য কমানোর দৌড়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই বাংলাদেশের নারী যদি এখন একই সঙ্গে নিজের শরীরের নিরাপত্তা, জনপরিসরে চলাচলের স্বাধীনতা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হন, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
সবচেয়ে বড় কথা হলো অগ্রগতিটা যেন থেমে না যায়। কারণ নারী পিছিয়ে গেলে আসলে বাংলাদেশই পিছিয়ে যায়।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।