,

সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের ১৪.৫১ কোটি টাকা ফেরাল কর্তৃপক্ষ

আর্থিক সংকটে থাকা সাতটি জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহকের বকেয়া বিমা দাবি পরিশোধ করেছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এসব দাবি নিষ্পত্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের পাওনা ফেরানোর পাশাপাশি বিমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আর্থিকভাবে দুর্বল জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জমি, সরকারি সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত, সরকারি বন্ডসহ বিভিন্ন সম্পদ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব সম্পদ বিক্রি বা নগদায়নের পর পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পৃথক ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পরে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী পুরোনো ও বকেয়া দাবিকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নীভিন সম্প্রতি জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সাত থেকে আটটি আর্থিকভাবে দুর্বল বিমা প্রতিষ্ঠানের দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের যেসব সম্পদ ব্যবহার করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব, সেগুলো চিহ্নিত করে অর্থ সংগ্রহের কাজ চলছে। এরই মধ্যে কিছু সম্পদ বিক্রি করা হয়েছে এবং আরও কিছু সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

পরিকল্পনাটি এমনভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যাতে সম্পদ বিক্রির অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কার্যক্রমে ব্যবহৃত না হয়ে সরাসরি গ্রাহকদের বকেয়া দাবি পরিশোধে কাজে লাগে। পৃথক ব্যাংক হিসাবে অর্থ সংরক্ষণের ফলে অর্থের ব্যবহারও নজরদারির মধ্যে রাখা সম্ভব হচ্ছে।

তবে সাতটি প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহককে ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও দেশের বিমা খাতের সামগ্রিক বকেয়া দাবির তুলনায় এই অর্থ খুবই সীমিত। কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১২ লাখ বিমা গ্রাহকের দাবি এখনও অপরিশোধিত রয়েছে। ৩২টি বিমা প্রতিষ্ঠান বকেয়া দাবি পরিশোধে সমস্যায় রয়েছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসব অপরিশোধিত দাবির মোট পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।

জীবনবিমা খাতেও দাবি পরিশোধের চিত্র পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। ২০২৪ সালে জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে মোট প্রায় ১৩ হাজার ৫৬ কোটি টাকার দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ হাজার ৬০৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। সে বছর মোট দাবির বিপরীতে পরিশোধের হার ছিল ৬৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই হার কিছুটা বেড়ে ৬৬ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়ায়।

সাধারণ বিমা খাতে পরিস্থিতি আরও দুর্বল। ২০২৪ সালে প্রায় ৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকার দাবির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো ১ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা পরিশোধ করে। ফলে দাবি পরিশোধের হার দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৮৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে তা আরও কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমে আসে।

বিমা খাতের দীর্ঘদিনের দাবি-সংকটের অন্যতম প্রভাব পড়েছে গ্রাহকদের আস্থায়। পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কিংবা নির্ধারিত শর্ত পূরণ করার পরও যদি গ্রাহক সময়মতো অর্থ না পান, তাহলে নতুন করে বিমা করার আগ্রহ কমে যেতে পারে। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানও মনে করেন, বকেয়া দাবি নিষ্পত্তি করা গেলে ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

দাবি পরিশোধের পাশাপাশি বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারকির জন্য ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে থেকেই শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রতিটি বিমা পলিসির জন্য স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকের পলিসি, প্রিমিয়াম পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য আরও সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা সম্ভব হবে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করছে। বিমা প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে কিছু বিমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতির বিষয়ও উঠে এসেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্যভান্ডার ব্যবহারের অভিযোগের কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এসব অনিয়ম ঠেকাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তথ্যব্যবস্থা একীভূত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

বিমা খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে বকেয়া দাবি পরিশোধের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ, সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন এবং গ্রাহকের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাতটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা পরিশোধের উদ্যোগ সেই বৃহত্তর সংস্কার প্রক্রিয়ার একটি অংশ। তবে খাতটির আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত দাবি নিষ্পত্তি এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।